আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য নিরসন নীতি বনাম দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্থান নির্বাচন

দ্বিতীয় যমুনা সেতু কোথায় নির্মিত হলে প্রথম সেতু থেকে তুলনামূলক দূরে থাকা জেলাগুলোর দূরত্ব কমবে এবং নতুন একটি অঞ্চলকে উন্নয়নের ধারায় যুক্ত করা হবে, তা বিবেচনায় নিলে গাইবান্ধা জেলার নামটিই সর্বাগ্রে থাকবে।

আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য নিরসন নীতি বনাম দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্থান নির্বাচন

মাহফুজ ফারুক :

উত্তরের মানুষের এতদিনের জিজ্ঞাসা ছিল, সরকার কী আদৌ দ্বিতীয় যমুনা সেতু করবে? তবে এ প্রশ্নের এক ধরনের উত্তর তারা পেয়ে গেছেন। সেটি বোঝা যায় প্রশ্নটি পরিবর্তিত হওয়ার কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরের মানুষের আন্দোলন থেকে চায়ের আড্ডা পর্যন্ত আলোচনা-পর্যালোচনা, স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের কাভারেজ এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর বিষয়টি এমন পর্যায়ে অবস্থান করছে যে, স্বভাবতই প্রথম প্রশ্নটির স্থান দখল করে ফেলেছে, দ্বিতীয় যমুনা সেতু কোথায় নির্মিত হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে গাইবান্ধা, বগুড়া ও কুড়িগ্রামের নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে গাইবান্ধা ও বগুড়া জেলার অধিবাসীরা এ নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি ও আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। সেসব আন্দোলনের গণমানুষের যে জোয়ার তা কারোরই চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে গাইবান্ধা জেলায় যেভাবে আন্দোলনের জোয়ার তৈরি হয়েছে তা সংগত কারণেই উল্লেখ করার মতো।

প্রশ্ন হলো আন্দোলনের জোয়ারের উপর কী স্থান নির্বাচনের বিষয়টি নির্ভর করবে? যদি হয় তাহলে গাইবান্ধা এগিয়ে থাকবে। অন্যদিকে যদি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বিবেচনা করা হয় তাহলে এগিয়ে থাকবে বগুড়া।

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোনো অঞ্চলের আন্দোলনের মাত্রা বা রাজনৈতিক প্রভাবকে যদি মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে জাতীয় ও আঞ্চলিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

এক্ষেত্রে সরকারের সম্ভাব্য পদক্ষেপ কী হতে পারে তার কিছু নমুনাও আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখতে পেয়েছি। চলতি বছরের ২৪ মার্চ রংপুরে অনুষ্ঠিত ‘উত্তরাঞ্চলে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং শিল্পায়ন সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এই অনুষ্ঠানের শিরোনাম ও উপদেষ্টার বক্তব্যে আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য নিরসনের যে প্রতিশ্রুতি তার দিকে তাকালে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হবে গাইবান্ধা।

কেননা বিদ্যমান (প্রথম) যমুনা সেতু রাজধানীর সাথে উত্তরাঞ্চলের যে সংযোগ তৈরি করেছে, তার পশ্চিমাংশে প্রবেশদ্বার হিসেবে রয়েছে বগুড়া জেলাসহ উত্তরের প্রায় সবকটি জেলা। এই বিবেচনাকে সামনে রাখলে বগুড়ায় দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ হবে একটি বিলাসী ও নামমাত্র বিকল্প ২য় যমুনা সেতু। যা শুধুমাত্র একই অঞ্চলের যানবাহনের চাপ কমানো ছাড়া তেমন কোনো ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না। পক্ষান্তরে তা বর্তমান সরকারের আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের উদ্যোগকে একটি লোক দেখানো তথা জনগণের সাথে তামাশার উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু কোথায় নির্মিত হলে প্রথম সেতু থেকে তুলনামূলক দূরে থাকা জেলাগুলোর দূরত্ব কমবে এবং নতুন একটি অঞ্চলকে উন্নয়নের ধারায় যুক্ত করা হবে, তা বিবেচনায় নিলে গাইবান্ধা জেলার নামটিই সর্বাগ্রে থাকবে।

সরকার যদি প্রভাবিত না হয়ে আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য নিরসন তথা জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থকে সামনে রেখে স্থান নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়, তাহলে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন হবে। এর জন্য সর্বজন গ্রহণীয় একটি সমীক্ষার মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার বলে মনে করি। এই সমীক্ষায় যদি গাইবান্ধা জেলার উপযোগিতা না থাকে কিংবা বগুড়া জেলাও বাদ পড়ে, তবে সেটিও গণমানুষকে অবহিত করা এবং কোথায় নির্মিত হলে তা জাতীয় উন্নয়ন স্বার্থকে অধিকতর ত্বরান্বিত করবে, সেদিকেই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

* গল্পকার ও গণমাধ্যমকর্মী