মাত্র ১০ টাকায় রুম গাইবান্ধার ঐতিহাসিক ‘সোহাগ বোর্ডিং’র ভালোবাসার গল্প

ঐতিহাসিক

নিজস্ব প্রতিবেদক :

গাইবান্ধা শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে ‘সোহাগ বোর্ডিং’। এটি কেবল একটি আবাসিক হোটেল নয়, বরং এটি একটি জেলার ইতিহাস, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির সাক্ষী। এক সময় মাত্র ১০ টাকায় রাত কাটানো যেত এখানে, যা আজ সময়ের বিবর্তনে ২০০ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই ঐতিহ্যবাহী বোর্ডিংয়ের নেপথ্যের কাহিনী এবং আভিজাত্যের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

শুরুর ইতিহাস ও রূপান্তর সোহাগ বোর্ডিংয়ের শুরুটা হয়েছিল প্রায় ৪০ বছর আগে। মজার ব্যাপার হলো, এটি প্রথমে আবাসিক হোটেল হিসেবে তৈরি হয়নি, বরং করা হয়েছিল একটি মার্কেট। কিন্তু মার্কেটটি সফল না হওয়ায় বর্তমান মালিকের বাবা এটিকে আবাসিক বোর্ডিংয়ে রূপান্তর করেন। শুরুর দিকে রুমের ভাড়া ছিল মাত্র ১০ টাকা, যা পরবর্তীতে ১২, ১৫ টাকা করে বাড়তে বাড়তে বর্তমানে ২০০ টাকায় পৌঁছেছে।

ইতিহাস ও রাজনীতির সাক্ষী এই বোর্ডিংটির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে এটি ছিল আওয়ামী লীগ অফিস। বলা হয়ে থাকে, এই সোহাগ বোর্ডিং চত্বর থেকেই প্রথম স্বাধীনতার পতাকা ওড়ানো হয়েছিল। বহু জানা-অজানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এখানে পদধূলি দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিভাজনের আগে এটি ছিল মুক্তচিন্তা ও আড্ডার প্রধান কেন্দ্র।

তারকাদের মিলনমেলা সংস্কৃতি ও নাট্যজগতের দিকপালরা এক সময় গাইবান্ধা এলে সোহাগ বোর্ডিংকেই বেছে নিতেন থাকার জন্য। হুমায়ুন ফরীদি, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, ড. সেলিম আল দীন এবং আফসার আহমেদের মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বরা এখানে অবস্থান করেছেন। আজও সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সংস্কৃতিকর্মীদের আড্ডায় মুখর থাকে এই বোর্ডিংয়ের একতলার ছাদ।

আস্থার এক অনন্য ঠিকানা বোর্ডিংটির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর বিশ্বস্ততা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ীরাও এখানে অবস্থান করেন। অনেকে তাদের মূল্যবান সম্পদ বা টাকা-পয়সা বোর্ডিং কর্তৃপক্ষের কাছে গচ্ছিত রেখে নিশ্চিন্তে থাকেন এবং যাওয়ার সময় তা নিয়ে যান। এই আস্থার কারণেই মানুষ বারবার এখানে ফিরে আসে।

মানবিকতার প্রতীক সোহাগ বোর্ডিং শুধুমাত্র ব্যবসার জন্য নয়, মানবিকতার জন্যও পরিচিত। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় যখন মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, তখন বহু দুর্গত মানুষকে এখানে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। আজও কোনো অভাবী মানুষ বা মুক্তিযোদ্ধা বিপদে পড়লে এখানে সাশ্রয়ী মূল্যে বা কখনো নামমাত্র মূল্যে থাকার সুযোগ পান।

নামের সার্থকতা বোর্ডিংয়ের বর্তমান পরিচালক জানান, ‘সোহাগ’ নামটি তার বাবার দেওয়া। এটি কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি ভালোবাসার জায়গা। ভবিষ্যৎ সংস্কারের পরিকল্পনা থাকলেও এর ঐতিহ্য এবং আড্ডার পরিবেশ ধরে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য।

গাইবান্ধার সোহাগ বোর্ডিং আজও তার সীমিত পরিসরে সাধারণ মানুষের জন্য এক টুকরো স্বস্তি এবং ভালোবাসার আশ্রয় হিসেবে টিকে আছে।