ব্রহ্মপুত্রের দীর্ঘশ্বাস ঘুচুক স্বপ্নের সেতুতে
প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে মাত্র চার মিনিটের পথ পাড়ি দিতে চার ঘণ্টা সময় লাগা কতটা অমানবিক! এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার নীরব সাক্ষী হয়ে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ পার করছে আজন্ম অবহেলিত এক জনপদের মানুষ। তাদের অনিশ্চিত ভাগ্য আর চাপা দীর্ঘশ্বাস প্রতিনিয়ত জমা হচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের জলে। অথচ এখানেই ছিল এক গৌরবোজ্জ্বল অতীত, যা আজ কেবলই ইতিহাস।
রেজা করিম :
এই তো ক’দিন আগের কথা। কর্মসংস্থানের তাগিদে আমি রাজধানী ঢাকায় আর চাকরিসূত্রে ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে থাকতে হয় আমার সহধর্মিণীকে। সেখান থেকে আমাদের শিকড়, আপন আলয় গাইবান্ধায় ফিরতে হলে ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দেওয়া ছাড়া আর বিকল্প কিছু নেই। একমাত্র ভরসা ছিল খোলা নৌকা। ভরা বর্ষার মৌসুমে কিছুটা সময় কম লাগে, তাও দুই ঘণ্টার কম না। আর শীত কিংবা খরায় যখন নদীর জল শুকিয়ে আসে, তখন সাপের মত আঁকাবাঁকা পথ ঘুরে ঘুরে এক পার থেকে আরেক পারে যেতে সময় লাগে অন্তত ঘণ্টা চারেক।
ছুটি ছাটায় মাঝে মাঝে গাইবান্ধা যাওয়ার সুযোগ হতো আমার স্ত্রী পুত্রদের। আর সেদিন দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে আমার স্ত্রীর ব্রহ্মপুত্র পারাপারের সময়টুকুতে ঢাকায় বসে কাটত চরম উৎকণ্ঠায়। যতক্ষণ না ওপার থেকে ‘নিরাপদে পৌঁছেছি’ বার্তাটি আসত, ততক্ষণ বুকের ভেতর যেন এক অদৃশ্য পাথর চেপে থাকত। কতটা যে মানসিক যন্ত্রণা, কতটা যে অস্বস্তি-তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আর সেদিনের আকাশটা যদি হতো মেঘলা, তবে উৎকণ্ঠা বেড়ে যেত দ্বিগুণ। কালবৈশাখির ঝড়-তুফান আর বজ্রপাতের সেই উন্মত্ত রূপের মাঝে, মাঝনদীতে ছাদখোলা এক নৌকায় দুটো ছোট সন্তান নিয়ে একজন মায়ের অসহায়ত্ব-এমন পরিস্থিতি চিন্তা করতেও ভয় লাগে।
আমাদের সেই যন্ত্রণাময় জীবনের শেষ অধ্যায়টাও ছিল এক তিক্ত অভিজ্ঞতায় মোড়ানো। আজ যখন লিখতে বসেছি, তখন আমার স্ত্রীর বদলি হয়ে দেওয়ানগঞ্জ থেকে একেবারে বিদায় নেওয়ার দিনটির কথা মনে পড়ছে। আগের রাত থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি, থামার কোনো লক্ষণ নেই। সরকারি চাকরি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা; তাই ক’দিন দেরি করারও উপায় ছিল না। কথা ছিল সকালেই রওনা দেব। সেই অনুযায়ী বন্ধু বাবুলের তত্ত্বাবধানে আগের রাতেই নৌকা এসে ভিড়েছিল বাহাদুরাবাদ ঘাটে। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও আকাশ পরিষ্কার হলো না। আমাদের মনের মেঘও ঘনীভূত হচ্ছিল। এবারও সেই চেনা ভয়-মাঝনদীতে যদি আবার ঝড়-তুফান শুরু হয়! সেই অমোঘ আতঙ্ক বুকে নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল। বাহাদুরাবাদঘাট থেকে মালপত্র বোঝাই নৌকায় যাত্রা শুরুর পর গন্তব্য বালাসীঘাটে পৌঁছানো পর্যন্ত সর্বক্ষণ সঙ্গী ছিল অবর্ণনীয় উৎকণ্ঠা। ভাগ্য সহায় ছিল, কালো মেঘ ফুঁড়ে বৃষ্টি যখন নামল, ততক্ষণে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেছি।
সেদিনের সেই যাত্রায় নৌকার গলুইয়ে বসে ঘুরেফিরে বারবার একটা কথাই মাথায় আসছিল-একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, যেখানে পৃথিবী বুলেটের গতিতে এগোচ্ছে, সেখানে আমাদের জীবনের গতি থমকে আছে ব্রহ্মপুত্রের জলে, চরে আর নৌকার মন্থর ছন্দে। প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে মাত্র চার মিনিটের পথ পাড়ি দিতে চার ঘণ্টা সময় লাগা কতটা অমানবিক! এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার নীরব সাক্ষী হয়ে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ পার করছে আজন্ম অবহেলিত এক জনপদের মানুষ। তাদের অনিশ্চিত ভাগ্য আর চাপা দীর্ঘশ্বাস প্রতিনিয়ত জমা হচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের জলে। অথচ এখানেই ছিল এক গৌরবোজ্জ্বল অতীত, যা আজ কেবলই ইতিহাস।
প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার যুগে সেই সময়েও নদী পারাপার এমন জরাজীর্ণ ছিল না, এখন যতটা। গাইবান্ধার বালাসীঘাট এবং দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাটের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একটা সময় ছিল যখন এই দুই ঘাটের মধ্যে নিয়মিত ফেরি চলাচল করত। এর চেয়েও বড় কথা, এই রুটটি ছিল রেল যোগাযোগের এক ঐতিহাসিক লাইফলাইন। উত্তরবঙ্গের মানুষ রেলে চেপে বালাসীঘাট আসতেন, সেখান থেকে ফেরি পার হয়ে ওপারে বাহাদুরাবাদ ঘাটে গিয়ে আবার ট্রেনে চড়তেন। তৎকালীন যাতায়াত ব্যবস্থায় এটি ছিল এক যুগান্তকারী ও আরামদায়ক অধ্যায়। কিন্তু ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু চালুর পর ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্যবাহী ফেরি ও রেল পারাপার বন্ধ হয়ে যায়। রেলপথের এই সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় উত্তরবঙ্গের মানুষের নতুন ভোগান্তি। বর্তমানে উত্তরবঙ্গের মানুষকে রেলপথে ঢাকায় যেতে হলে অনেকটা পথ ঘুরে, অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে যেতে হয়। যে দূরত্বটি বালাসী-বাহাদুরাবাদ হয়ে মুহূর্তেই পার হওয়া যেত, তা আজ এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রায় রূপ নিয়েছে।
বালাসীঘাট ও বাহাদুরাবাদঘাটকে সংযুক্ত করে একটি ‘দ্বিতীয় যমুনা সেতু’ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল একটি সেতু নয়, এটি হতে পারে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির এক মহাসনদ। এই সেতুটি নির্মিত হলে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের দূরত্ব ও ভ্রমণের সময় অনেকটাই কমে আসবে। মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির চিরতরে অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে, রেলপথের সেই পুরোনো গৌরব আবার পুনরুজ্জীবিত হবে, যা যাতায়াত ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
এই সেতুর হাত ধরে দেওয়ানগঞ্জ আবার ফিরে পাবে তার হারিয়ে যাওয়া পুরোনো জৌলুস। এককালে যা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, তা আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে। দুই পারের মানুষের মধ্যে তৈরি হবে নিবিড় সংযোগ, উন্মুক্ত হবে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিশাল দ্বার। কৃষিপ্রধান উত্তরবঙ্গের উৎপাদিত ফসল সহজেই পৌঁছে যাবে রাজধানীতে, প্রান্তিক কৃষকরা পাবেন পণ্যের সঠিক মূল্য। সামগ্রিকভাবে, এই একটি সেতু পুরো উত্তরবঙ্গের চেহারাই নানাদিক থেকে পাল্টে দেবে।
দেশে কত শত সেতু হয়, কত চোখধাঁধানো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবিটি বারবার উপেক্ষিতই থেকে গেছে। প্রতিবার দাবি ওঠে, কিছুদিন চায়ের কাপে ঝড় চলে, উপর মহল থেকে আসে আশ্বাসের বাণী। কিন্তু সময় বয়ে যায়, আশ্বাসের রঙ ফিকে হয়, আর সেতু নির্মাণের স্বপ্ন মাঝনদীতেই ডুবে থাকে।
অবশেষে সুড়ঙ্গের শেষে আলোর রেখার মতো, নতুন সরকারের আগমনে আবারও সামনে এসেছে এই যৌক্তিক দাবি। বালাসী-বাহাদুরাবাদঘাটকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবিতে এখন মুখর দুই পাড়ের মানুষ। একটি সেতু কেবল ইট-পাথর-কংক্রিটের কাঠামো নয়; এটি একটি জনপদের কান্না মোছার রুমাল, দুটি অঞ্চলের মেলবন্ধনের সেতুসূত্র। নতুন সরকারের কাছে উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের বিনীত প্রত্যাশা-এবার আর কোনো আশ্বাস নয়, এবার যেন বাস্তবতার আলো দেখে আমাদের স্বপ্নের সেতু। ব্রহ্মপুত্রের বুক থেকে মুছে যাক দীর্ঘশ্বাস, সুগম হোক মানুষের নিরাপদ যাত্রা। অবসান ঘটুক অমানবিক চড়াই-উতরাইয়ের।
* সংগীত শিল্পী ও সাংবাদিক।