ধ্বংসের পথে নলডাঙ্গা জমিদার বাড়ি

হুমকির মুখে সাড়ে সাতশ বছরের পুরনো ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক :

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক নলডাঙ্গা জমিদার বাড়ি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গ, শ্বেত পাথরের বৃষ মন্দির আর কাশি থেকে আনা নকশা করা পাথরের কারুকার্যমণ্ডিত এই স্থাপনাটি প্রায় সাড়ে সাতশ বছরের পুরনো ইতিহাসের সাক্ষী। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই জমিদার বাড়ির গৌরবময় অতীত ও বর্তমান দুরাবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

জমিদারির বিস্তার ও প্রভাব নলডাঙ্গা জমিদারদের প্রভাব শুধুমাত্র স্থানীয় এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের জমিদারি বিস্তৃত ছিল পশ্চিম দিনাজপুর, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা এবং বগুড়ার শেরপুর পর্যন্ত। জনশ্রুতি আছে, মুর্শিদাবাদের সাথে সংযোগকারী একটি নদীর তীরে এই স্থানটি পছন্দ করে তারা জমিদারি শুরু করেছিলেন।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও তুলসী লাহিড়ী অন্যান্য জমিদার বাড়ির চেয়ে নলডাঙ্গা জমিদার বাড়ির ইতিহাস কিছুটা ভিন্ন, কারণ এই পরিবারটি ছিল অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা। উপমহাদেশের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও নাট্যকার তুলসী লাহিড়ী (আসল নাম হেমেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী) এই পরিবারেরই সন্তান। তিনি ৫২টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং প্রায় ৫০-৬০টি নাটক লিখেছেন। তার কালজয়ী নাটক ‘ছেঁড়া তার’-এর সংলাপগুলো এই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত।

জনকল্যাণমূলক কাজ জমিদার পরিবারটি জনহিতকর কাজেও অগ্রণী ছিল। এলাকায় পানীয় জলের তীব্র সংকট মেটাতে তারা ৫ একর ১৭ শতাংশ জায়গার ওপর একটি বিশাল পুকুর খনন করেছিলেন। আজও সেই পুকুরের পানিই আশেপাশের মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান এই পরিবারের উত্তরসূরিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও অবদান রেখেছেন। তুলসী লাহিড়ীর বংশধর হরেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন নিয়মিত যন্ত্রবাদক ছিলেন। তিনি ঢাকা, রাজশাহী ও রংপুর বেতারে সেতার বাজাতেন।

বর্তমান অবস্থা সাড়ে সাতশ বছরের পুরনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে আজ বিলুপ্ত হতে বসেছে। স্থানীয়রা মনে করেন, এই জমিদার বাড়িটি শুধুমাত্র একটি স্থাপনা নয়, বরং এটি এদেশের সংস্কৃতি ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সঠিক তদারকি ও প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা না হলে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে নলডাঙ্গা জমিদার বাড়ির এই অমূল্য ইতিহাস।