আজ পাটের ব্যাগ বদলে দিয়েছে জীবন

উদ্যোক্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

তিন সন্তান নিয়ে এক কাপড়ে ঘর ছাড়তে হয়েছিল তাকে। সমাজের অবজ্ঞা, পারিবারিক অসহযোগিতা আর চরম অর্থকষ্টে এক সময় আত্মহত্যার চিন্তাও করেছিলেন। কিন্তু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে হার মানেননি। আজ তিনি গাইবান্ধার একজন সফল নারী উদ্যোক্তা, যার হাতের তৈরি পাটের ব্যাগ ও শিল্পকর্ম বদলে দিয়েছে তার জীবনের গল্প। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে উঠে এসেছে উদ্যোক্তা হোসনেয়ারার এই অশ্রুভেজা ও অনুপ্রেরণামূলক কাহিনী।

অন্ধকার অতীত ও জীবনযুদ্ধ হোসনেয়ারা জানান, তার বৈবাহিক জীবন ছিল বিভীষিকাময়। স্বামীর অত্যাচার আর পরকীয়ার কারণে তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি পথে বসতে বাধ্য হন। ডিভোর্সের পর সমাজ ও পরিবার তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। এমনকি সন্তানদের বাবার কাছে রেখে নতুন করে সংসার করার পরামর্শও দিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু হোসনেয়ারা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এক বেলা না খেয়ে থাকলেও সন্তানদের নিজের কাছেই রাখবেন। সেই সময় এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে, মাঝেমধ্যেই মনে হতো সন্তানদের নিয়ে বিষ খেয়ে মারা যান।

পাটের হাত ধরে নতুন স্বপ্ন বিউটি পার্লার দিয়ে কাজ শুরু করতে চাইলেও স্বামীর হয়রানি ও পরিবারের বাধায় তা সম্ভব হয়নি। এরপর তিনি বেছে নেন পাটের কাজ। শুরুতে মাত্র ১৫০ টাকায় একটি ‘শিকা’ বিক্রি করে তার ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে তার একটি ছোট কারখানা এবং দোকান রয়েছে। তার তৈরি পণ্যের তালিকায় রয়েছে আধুনিক পাটের ব্যাগ, পাপোশ, টেবিল রানার, জুয়েলারি বক্স, জায়নামাজ ও শিকা। এছাড়া তিনি মাশরুম চাষ এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির প্রকল্পের সাথেও যুক্ত আছেন।

চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান সচ্ছলতা হোসনেয়ারা জানান, বর্তমান বাজারে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক যুগের শৌখিন মানুষরা ঘর সাজাতে তার তৈরি শিকা ও ব্যাগগুলো পছন্দ করছেন। মাসে গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি দেখছেন ব্যবসার পুঁজি। কোনো গ্যারান্টার না থাকায় ব্যাংক ঋণ পেতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে। তবে সন্তানদের পড়াশোনা এবং নিজের দোকান ও কারখানা চালিয়েও তিনি আজ ঋণমুক্ত।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সরকারের কাছে আহ্বান হোসনেয়ারার স্বপ্ন তার গ্রামেই অন্তত ২০০ নারীর কর্মসংস্থান হবে এমন একটি বড় কারখানা গড়ে তোলা। তিনি চান সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ, যাতে তার মতো আরও অনেক নারী স্বাবলম্বী হতে পারেন। এছাড়া সরকারিভাবে মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে তার তৈরি পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতো বলে তিনি মনে করেন।

যোগাযোগ অনলাইনে তার একটি ছোট পেজ রয়েছে যার নাম ‘স্বপ্নকুটির’ (Shopno Kutir)। এছাড়া তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি ‘হুসনিয়ারা হাসনা’র মাধ্যমেও গ্রাহকরা তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

হোসনেয়ারার এই বদলে যাওয়া জীবন প্রমাণ করে যে, অদম্য ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে আলোর পথে আসা সম্ভব।