ঝিনুক পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে সাদা সোনা
গাইবান্ধার চুন শিল্পের কারিগরদের জীবনকাহিনী
নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঝিনুক বা শামুকের খোলস পুড়িয়ে বিশেষ কায়দায় তৈরি করা হয় চুন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে একসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গাইবান্ধার একটি নির্দিষ্ট পাড়ার প্রায় সব পরিবারই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই চুন তৈরির ব্যবসার সাথে জড়িত। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই প্রাচীন শিল্পের কারিগরদের অমানুষিক পরিশ্রম ও জীবন সংগ্রামের চিত্র উঠে এসেছে।
বাপ-দাদার পেশা ও ঐতিহ্যের টান চুন তৈরির এই কারিগরেরা জানান, এটি তাদের জাতিগত ও বংশপরম্পরার ব্যবসা। তারা এই কাজ শিখেছেন তাদের বাবা ও দাদাদের কাছ থেকে। শিক্ষার অভাব এবং অন্য কোনো উন্নত কাজের সুযোগ না থাকায় তারা এই কষ্টসাধ্য পেশাকেই জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছেন।
তৈরির দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া চুন তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ এবং এতে প্রচুর ধৈর্য ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়: ১. প্রথমে নদী বা খাল-বিল সংলগ্ন এলাকা থেকে ঝিনুক বা শামুকের খোলস (শিপি) সংগ্রহ করা হয়। ২. সংগৃহীত খোলসগুলো বাড়িতে এনে ভালো করে পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়। ৩. এরপর কাঠের খড়ির সাহায্যে সাজিয়ে তীব্র আগুনে এগুলো পুড়িয়ে ছাই করা হয়। ১ মণ শিপি পুড়ালে প্রায় আধা মণ চুন পাওয়া যায়। ৪. পোড়ানো খোলসগুলো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে হাত দিয়ে ময়ান করে চুনে রূপান্তর করা হয়। চুন তৈরির প্রধান উপাদানই হলো আগুন আর পানি।
অমানুষিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যঝুঁকি আগুনের তীব্র তাপে কাজ করতে গিয়ে কারিগরদের চোখ-মুখ এবং শরীর অনেক সময় কালো হয়ে যায়। শরীর প্রচণ্ড হিট বা গরম হয়ে ওঠে, তবুও পেটের দায়ে তারা এই কাজ চালিয়ে যান। এছাড়া ১০ বাড়ি থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে ১০০ বাড়ি ঘুরে চুন বিক্রি করতে হয়, যা অত্যন্ত খাটনির কাজ। এই অমানুষিক কষ্টের কারণেই তারা চান না তাদের সন্তানরা এই পেশায় আসুক।
আর্থিক সংকট ও সামাজিক অবস্থান বর্তমানে বড় পুঁজির অভাবে তারা এই ব্যবসা বড় করতে পারছেন না। অনেকেই এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কোনোমতে ব্যবসা ও সংসার চালাচ্ছেন। পানের চাহিদা বাড়লে তাদের চুন বিক্রির পরিমাণও বাড়ে। তবে সামাজিকভাবে এই পেশার মানুষকে অনেকে নিচু নজরে দেখেন, যা তাদের মনে কষ্টের সৃষ্টি করে।
সহযোগিতার আহ্বান কারিগরদের মতে, সরকার যদি এই ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের সাথে জড়িতদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা বা আর্থিক সহযোগিতা করতো, তবে তারা এই শিল্পকে আরও উন্নত করতে পারতেন।
অভাব আর আগুনের উত্তাপের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা এই মানুষগুলোর চাওয়া—তাদের আগামী প্রজন্ম যেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে সুন্দর জীবনের দেখা পায়।



