২ টাকার লুঙ্গি আর ৫ টাকার ব্লাউজ: সেলাই করে ভাগ্য বদলানো এক নারীর গল্প

নারীর গল্প

এভাবে চলতে চলতে ঈদ চলে গেছে। তখন দুই–তিন হাজার টাকা করে কামাই করেছি। পাঁচ কাঠা করে, পাঁচ শতক করে জমি কিনেছি। তখন শুনেছিলাম, নিকা করে দুই আড়াই লাখ টাকার জমি পাওয়া যায়, কিন্তু আমি পেয়েছি মাত্র দুই হাজার টাকা শতক দরে। এই জমিটা আমি বারো হাজার টাকা দিয়ে নিয়েছি। হাঁস বেচেছি, মুরগি বেচেছি, কাপড় সেলাই করেছি। দুইটা লুঙ্গি, পাঁচটা ব্লাউজ সেলাই করেছি। এভাবে টাকা জমিয়েছি। দলিল করতে মোটামুটি চৌদ্দ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

একটা ব্লাউজ সেলাইয়ের মজুরি তখন খুব কম ছিল। পরে ধীরে ধীরে টাকা বাড়তে থাকে। ছয় মাস পরে দশ টাকা, বিশ টাকা করে মজুরি বাড়ে। এখন পরিশ্রম বেশি, কিন্তু সব জিনিসের দামও অনেক বেশি। আগে পাঁচ টাকা হলে তেল পাওয়া যেত, এখন সে টাকায় কিছুই হয় না। এই কারণে সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে।

বিয়ের সময় অনেক কাজ করেছি। মেশিন দিয়েছি, বিয়েতে গিয়েছি, সব দিকেই সহযোগিতা করেছি। ছোটবেলা থেকে কাজ শিখেছি। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় স্কুল থেকে এসে কাপড় খুলে কিছু খেয়ে আবার কাজে চলে যেতাম। সেখানে সুতা কাটা, ছোটখাটো কাজ করতাম। পরে মেশিনে বসতে শিখলাম। প্রথমে ভয় লাগত, তবুও ধীরে ধীরে নাগা দেওয়া, ফিতা সেলাই, পেটিকোটের কাজ করা শিখে ফেলি।

একদিন কাপড় এনে দেয় কাটার জন্য। আমি আগে কখনো কাপড় কাটিনি, সাহস পাইনি। দাঁতের কয়লা দিয়ে দাগ টেনে দশ টাকার একটা ছোট কাঁচি দিয়ে কাপড় কাটলাম। সেলাই করে জামাটা বানালাম। পরে আবার ঠিক করে কাটাছেঁড়া করে সেলাই দিলাম। এভাবে করতে করতেই কাজ শিখে গেলাম।

এসএসসি পরীক্ষা দিইনি। তখন শুধু কাপড় আর কাপড়—মানুষের কাপড় সেলাই করে দিতাম, অনেক সময় টাকা নিতাম না। এক চাচা আমাকে একটা মেশিন কিনে দেন। সেই মেশিনে টুকটাক কাজ করতে করতেই বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পরে এখানে এসে তিন–চার মাস পরপর কাজ বাড়তে থাকে। আগে দোকান ছিল না, পরে কাপড় এনে কাটাছেঁড়া করে সেলাই দিতে দিতে কাজ বাড়ে।

আজ পাঁচটা সেলাই করলে কাল ছয়টা, এভাবে দিনে দিনে পনেরো–বিশটা পর্যন্ত সেলাই হতে থাকে। সংসার চালাই, বাচ্চা হয়। বাচ্চাদের খাওয়াদাওয়া, সংসারের সবকিছু সামলাতে হয়। বাইরে ঘুরে ঘুরে কাপড় বেচাকেনা আর সেলাইয়ের কাজ করেছি।

এভাবেই ঈদ এসেছে, দুই–তিন হাজার টাকা করে আয় করেছি। আবার জমি কেনার সুযোগ পাই। আমার চাচার শ্বশুর বললেন, টাকা থাকলে জমি দেবেন—মাত্র দুই হাজার টাকা শতক দরে। হাঁস-মুরগি বিক্রি করে, লুঙ্গি আর ব্লাউজ সেলাই করে টাকা জমিয়ে জমিটা কিনেছি। দলিলসহ মোট চৌদ্দ হাজার টাকা লেগেছে।

এরপর ধীরে ধীরে এই জায়গাতেই ঘর তুলেছি। ছেলে-মেয়েরা বড় হচ্ছে, লেখাপড়া করছে। এভাবেই জীবন চলছে। আমি অনেকদিন এসকেএসের সঙ্গে ছিলাম। ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় সদস্য ছিলাম। প্রায় বিশ–ত্রিশ বছর এভাবেই কেটে গেছে।

এরপর বাবা পাঁচ বছর অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসা, সংসার, ছেলে-মেয়ের বিয়ে—সব মিলিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর কিছুদিন খুব কষ্ট গেছে। পরে ছেলে-বুদ্ধি করে আবার দোকানটা চালু করি।

এখন আমি ছোট বাচ্চাদের প্যান্ট, শার্ট, ইংলিশ প্যান্ট, পায়জামা, জামা, ম্যাক্সি, থ্রি-পিস—সব বানাই। শুধু ফুলপ্যান্ট আর পাঞ্জাবি বানাই না। আশপাশের লোকজনই বেশি আসে। আগে বাবা ব্যবসা করতেন, দূরের মানুষও আসত। এখন তিনজন কাজ করে। আমি কাপড় কাটি, তারা সেলাই করে।

একাই সব করা সম্ভব না—কাপড় কাটা, সেলাই, সংসারের কাজ—সব মিলিয়ে মানুষ রেখে কাজ করাতে হয়। মাপ নেওয়া, কাপড় বুঝিয়ে দেওয়া, পছন্দ অনুযায়ী কাজ করা—এভাবেই সময় চলে যায়।

ভবিষ্যতে অনেক পরিকল্পনা আছে। এখন পর্যন্ত এই অবস্থানে আছি। দোকানটা মাঝখানে একটু ডাউন ছিল, এখন আবার উন্নতি হচ্ছে। সামনে আরও পরিবর্তন হবে—এইটাই আমার ভবিষ্যৎ।