টাকা নেওয়া যায় কিন্তু হোটেলে বসে খেতে দেওয়া হয় না
মানবতা
নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বাধীন দেশে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার এক করুণ চিত্র উঠে এসেছে গাইবান্ধার হরিজন বা সুইপার সম্প্রদায়ের জীবনগাঁথায়। শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সমাজের একশ্রেণির মানুষের কাছে তারাই চরম অস্পৃশ্য ও ঘৃণিত। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
হোটেলেও অস্পৃশ্যতা: এক পৈশাচিক অভিজ্ঞতা হরিজন সম্প্রদায়ের অভিযোগ, তারা সাধারণ হোটেলে বসে খাবার খেতে পারেন না। খাবার কিনতে গেলে টাকা নেওয়া হলেও তাদের ভেতরে বসতে দেওয়া হয় না। হোটেলের বাইরে থেকে কাগজের ঠোঙায় করে খাবার ছুড়ে দেওয়া হয়, যেন তারা মানুষ নন। সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি আক্ষেপ করে বলেন, “একটা বানর যদি চা খেতে পারে, আমরা কি মানুষ না? আমরা কি জানোয়ার?” অথচ একই পেশায় নিয়োজিত অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ ঠিকই হোটেলে বসে খাওয়ার সুযোগ পান।
প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রায় দেড় বছর আগে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাদের হোটেলে বসে খাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই নির্দেশের কোনো কার্যকর প্রতিফলন ঘটেনি। এমনকি ডিসি অফিসের পাশে তাদের কলোনি হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা তাদের খোঁজ নিতে আসেন না বলে তারা অভিযোগ করেন।
চাকরি ও সামাজিক ভাতা থেকে বঞ্চিত এই সম্প্রদায়ের শিক্ষিত তরুণদের অভিযোগ, তাদের জন্য বরাদ্দকৃত পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পদগুলোতেও এখন অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ নিয়োগ পাচ্ছে। অভিযোগ আছে, ঝাড়ুদারের সরকারি চাকরির জন্য ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়, যা দেওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। এছাড়া বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা কিংবা প্রতিবন্ধী ভাতার মতো সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত।
মানবেতর জীবনযাপন ভিডিওতে দেখা যায়, পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামী এবং প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটছে অনেকের। মাত্র ১৮০০ টাকা বেতনে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনকি কলোনির সরু রাস্তার কারণে তাদের মৃতদেহ বের করাও কঠিন হয়ে পড়ে। উন্নয়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি বললেই চলে।
হরিজন সম্প্রদায়ের এই আর্তনাদ মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, সামাজিক মর্যাদা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।



