ভাত জোটেনি খেয়েছেন আটার লই

কারিগরি

নিজস্ব প্রতিবেদক :

১৯৭৪ সালের সেই ভয়াল দুর্ভিক্ষ। ঘরে চাল নেই, ভাত জোটে না। পেটের ক্ষুধা মেটাতে কখনো আটার ‘লই’ (এক ধরণের তরল খাবার), কখনো আটার রুটি আবার কখনো গমের ভাত খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। অভাবের সেই দিনগুলোতে নিজের ছোট ভাই-বোন আর অসুস্থ বাবার মুখে অন্ন তুলে দিতে যে সংগ্রামের শুরু হয়েছিল, আজ তা এক সফলতার গল্প। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে উঠে এসেছে গাইবান্ধার প্রবীণ কারিগর আব্দুল আজিজের এই সংগ্রামী জীবনের কাহিনী।

অভাবের সেই শুরু আজিজ জানান, ১৯৭৩ সালে মামার কাছ থেকে কাজ শেখার মাধ্যমে তার কারিগরি জীবনের শুরু। সে সময় অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবা ছিলেন দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিকের রোগী। তিন ছোট ভাই-বোন আর অসুস্থ বাবার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আজিজ তখন গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে মেকারির কাজ করতেন। কখনো স্টেশনে রাত কাটিয়েছেন, কখনো মাথায় করে কয়েক কেজি আটা কিনে এনে গভীর রাতে ভাই-বোনদের রুটি বানিয়ে খাইয়েছেন।

বিশ্বাসের সন্ধানে শুরুতে অল্প বয়সী মেকার হওয়ায় মানুষ তাকে কাজ দিতে চাইত না। তখন তিনি এক বুদ্ধি বের করলেন—অসুস্থ ও বয়স্ক বাবাকে দোকানের সামনে বসিয়ে রাখতেন। বাবাকে দেখে কাস্টমাররা আশ্বস্ত হয়ে দোকানে আসত এবং আজিজ কাজ করার সুযোগ পেতেন। তখন দিনে ১০-১২ টাকা আয় হলেই আনন্দের সীমা থাকত না।

প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার বিবর্তন ১৯৮০ সালে ইউনিসেফের মাধ্যমে বগুড়া ভিটিটিআই থেকে এক মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন আজিজ। সেই থেকে পেট্রোল লাইট, টর্চলাইট আর তালা-চাবি মেরামতের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে তিনি এখন ইলেকট্রনিক্স পণ্যের সফল কারিগর। বর্তমানে তিনি রাইস কুকার, প্রেসার কুকার, গ্যাসের চুলা, ব্লেন্ডার ও মাইক্রোওয়েভ ওভেনের মতো জটিল সব যন্ত্র মেরামত করেন।

সততা ও বর্তমান অবস্থা আজিজ গর্বের সাথে জানান, দীর্ঘ এই কর্মজীবনে তিনি কখনো গ্রাহককে ঠকিয়ে বা মিথ্যা বলে টাকা নেননি। বর্তমানে তার মেজো ছেলে তাকে ছোটখাটো কাজে সাহায্য করে, আর বড় কাজগুলো তিনি নিজেই করেন। ঢাকার মহাজনদের কাছ থেকে মাল বাকি নিয়ে এসে ব্যবসা চালিয়ে আজ তিনি স্বাবলম্বী। গাইবান্ধার পুরাতন বাজারে তার দোকানে রাইস কুকার ও গ্যাসের চুলার যাবতীয় নতুন-পুরাতন খুচরা যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়।

আক্ষেপ ও প্রাপ্তি আজিজের মতে, এখনকার দিনে শুধু তালা-চাবির কাজ করে সংসার চালানো কঠিন। তাই তিনি আধুনিক ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দিকে ঝুঁকেছেন। পুরনো দিনের কষ্টের কথা মনে পড়লে এখনো চোখ ভিজে ওঠে তার, তবে বর্তমানের সচ্ছলতা ও গ্রাহকদের আস্থাই তার জীবনের বড় সার্থকতা।

দুর্ভিক্ষের সেই দিনগুলোতে অনাহারে থাকা কিশোর আজিজ আজ গাইবান্ধা শহরের একজন পরিচিত ও দক্ষ কারিগর। তার এই জীবন প্রমাণ করে যে, সততা আর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব।