৪২ বছর ধরে পায়ে হেঁটে পত্রিকা বিক্রি

জীবনসংগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক :

রোদ হোক বা বৃষ্টি, গত ৪২ বছর ধরে গাইবান্ধা শহরের অলিতে-গলিতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মাইল পায়ে হেঁটে পত্রিকা পৌঁছে দিচ্ছেন এক অদম্য জীবনসংগ্রামী। আধুনিক যুগে ইন্টারনেটের প্রসারে কাগজের পত্রিকার চাহিদা কমলেও, অভ্যাসের বশে এবং পেটের তাগিদে আজও তিনি রাজপথে। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই প্রবীণ হকারের দীর্ঘ চার দশকের সংগ্রামের চিত্র উঠে এসেছে।

দীর্ঘ পথচলা ও বর্তমান অবস্থা গাইবান্ধার বাদিয়াখালি থেকে প্রতিদিন যাত্রা শুরু করেন তিনি। এক সময় দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ পত্রিকা বিক্রি করলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮০-৯০টিতে। বয়স বাড়লেও থেমে নেই তার পথচলা। তিনি মনে করেন, প্রতিদিন ৩০-৪০ মাইল রাস্তা আপ-ডাউন করলে তার শরীরের গতি ও স্বাস্থ্য ভালো থাকে। শহরের ডিবি রোড, কালিবাড়ি, মাস্টারপাড়া থেকে শুরু করে বিডি রোড—সবখানেই তার পরিচিত মুখ দেখা যায়।

পত্রিকা বিক্রির লাভ-ক্ষতি পত্রিকা বিক্রিতে লাভের অঙ্ক খুবই সামান্য। তিনি জানান:

  • প্রথম আলো: ৮ টাকায় কিনে ১২ টাকায় বিক্রি করেন।

  • বাংলাদেশ প্রতিদিন: সাড়ে ৬ টাকায় কিনে ১০ টাকায় বিক্রি করেন।

  • করতোয়া ও ঘাগট: ৫ থেকে ৮ টাকায় বিক্রি করেন। ঘাগট ১ টাকায় কিনে ৩ টাকায় বিক্রি করেন। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেও দিনশেষে মাত্র ৩০০-৪০০ টাকার মতো আয় হয়, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব।

চ্যালেঞ্জ ও কষ্টের স্মৃতি দীর্ঘ এই কর্মজীবনে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। অনেক সময় কাস্টমাররা পত্রিকা নিয়ে টাকা দিতে দেরি করেন, আবার অনেকে টাকা না দিয়েই মারা যান বা চলে যান। অসুস্থ শরীরেও তাকে কাজ করতে হয়; এমনকি দুইবার চোখের অপারেশন করার পরও তিনি বিশ্রামের সুযোগ পাননি। একবার পত্রিকা বিক্রি করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলেন, পরে এক হৃদয়বান ব্যক্তি তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও আকুতি এখন আর আগের মতো শরীরে শক্তি পান না তিনি। তার শেষ ইচ্ছা—যদি কেউ একটু আর্থিক সহায়তা বা পুঁজি দিয়ে সাহায্য করত, তবে বাড়ির কাছে ছোট একটি দোকান দিয়ে বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটাতে পারতেন। হকারের এই পেশায় এখন আর নতুন কেউ আসতে চায় না বলে তিনি মনে করেন, কারণ অমানুষিক পরিশ্রমের তুলনায় আয় খুবই নগণ্য।

গাইবান্ধা শহরের এই পরিচিত হকার কেবল পত্রিকা বিলি করেন না, বরং তিনি চার দশকের এক জীবন্ত ইতিহাস। তার এই নিরন্তর সংগ্রাম সমাজ ও নতুন প্রজন্মের জন্য এক বড় শিক্ষা।