দ্বিতীয় যমুনা সেতু: বদলে দিতে পারে উত্তরের অর্থনীতি ও নারীর জীবন

দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ হলে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহ বিশেষ করে- গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় জেলাসমূহের মানুষের যোগাযোগ সহজীকরণ হবে। এর ফলে উত্তরের জেলাসমূহের সাথে রাজধানীসহ নৌ-বন্দর তথা সমুদ্রবন্দরের যোগাযোগ ও সমন্বয় সহজ ও শক্তিশালী হবে।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু: বদলে দিতে পারে উত্তরের অর্থনীতি ও নারীর জীবন

আফরোজা লুনা :

এক সময় যমুনা সেতুর দাবি ছিলো মানুষের বাস্তবতার চাহিদার প্রেক্ষিত। সেই দাবি পূরণে যোগাযোগের সুবিধা বেড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেতু নির্মাণের পর থেকে বাংলাদেশের উত্তর-দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম ও প্রধান ভরসা যমুনা বহুমুখী সেতু। ১৯৯৮ সালে চালু হয় যমুনা বহুমুখী সেতু। সেতু চালুর পর থেকে সময়ের পথ গড়িয়েছে অনেক দূর। ফলে প্রেক্ষাপটও পরিবর্তন হয়েছে কালক্রমায়। গত তিন দশকে যানবাহনের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে, যার কারণে সেতুর উপর যানবাহন ও পণ্য পরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাপ সামলে ওঠা অনেকটাই দায় হয়ে পড়েছে।

গাইবান্ধার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময়ে কিছু দাবি উঠে এসেছে সচেতন মহলের। যার মধ্যে মেডিকেল কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ রেলসেতু, অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা ইত্যাদি। ইতোমধ্যে জোরালো দাবি উঠে এসেছে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর।

সচেতন মহল মনে করছেন, আগামীর পরিবহন চাহিদা সহজকরণসহ জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নতুন একটি যমুনা সেতু শুধু অপরিহার্যই নয়, এটি এখন বাস্তবতাকে বহন করে। অবহেলিত উত্তরাঞ্চলের সাথে রাজধানীসহ অন্যান্য জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ সব মৌলিক অধিকার সুরক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করবে দ্বিতীয় যমুনা সেতু। উত্তরের মানুষের উন্নত শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, নারীর উচ্চ শিক্ষার হার বৃদ্ধি, প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী শ্রমিকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি, স্বল্পসময়ে পণ্য বাজারজাতকরণ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি, শিল্পের প্রসারসহ যাতায়াতের সুবিধা ও উন্নত জীবনমান এনে দিতে পারে দ্বিতীয় যমুনা সেতু। তাই দ্বিতীয় যমুনা সেতু এখন সময়ের দাবি।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সাম্প্রতিক আলোচনায় এর ইতিবাচক নানা দিক উঠে এসেছে। জামালপুরের  দেওয়ানগঞ্জ ও গাইবান্ধার ফুলছড়ির বালাসীঘাটের মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের অনেক জেলার সাথে রাজধানীসহ অন্যান্য জেলা ও অঞ্চলের যোগাযোগ উন্নত হবে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। যমুনা নদীর উপর নির্মিত বর্তমান যমুনা বহুমুখী সেতু দেশের অন্যতম এবং গুরত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো হিসেবে চলমান রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এই সেতুর উপর দিয়ে চলাচল করছে। দিন দিন সেতুর উপর বাড়ছে যানবাহনের চাপ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দুর্ঘটনায় সেতু মেরামত বা সংস্কারের কাজে চলাচল ব্যাহত হলে বিকল্প দ্বিতীয় যমুনা সেতু মানুষের ভোগান্তি দূরীকরণে সহায়ক হবে। 

দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ হলে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহ বিশেষ করে- গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় জেলাসমূহের মানুষের যোগাযোগ সহজীকরণ হবে। এর ফলে উত্তরের জেলাসমূহের সাথে রাজধানীসহ নৌ-বন্দর তথা সমুদ্রবন্দরের যোগাযোগ ও সমন্বয় সহজ ও শক্তিশালী হবে। ব্যবসায়িক গতি ফেরাতে সহায়ক হবে দ্বিতীয় যমুনা সেতু। উত্তরের জেলাসমূহের নদীভাঙন রোধ, কৃষিজমি ও বসতভিটা সুরক্ষা হবে। 

দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য সুফলসমূহ

·        উত্তরের আট জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র নদীর হাজার হাজার একর চরাঞ্চলসহ সমতল ভূমিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য সহজে রাজধানীসহ অন্যান্য জেলায় বাজারজাতের সুবিধা বাড়বে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা যাবে, ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি সহজ হবে ও পণ্য পরিবহন ব্যয় কমবে;

·        কৃষির উৎপাদন খরচ কমে যাবে;

·        উৎপাদিত কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ হবে;

·        কৃষিভিত্তিক শিল্পনগর গড়ে উঠবে;

·        পর্যটন সুবিধা বাড়বে;

·        শিল্পের প্রসার ঘটবে, শিল্প বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে;

·        পর্যটনখাত উন্নত হবে ও বিকাশ ঘটবে;

·        নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে;

·        দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ গড়ে উঠবে। 

দ্বিতীয় যমুনা সেতু নারী শ্রমিকদের সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে

দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই হবে তা নয়, বরং  নারীশ্রমিক, নারী উদ্যোক্তা ও কর্মজীবী নারীদের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে এতে কোনও সন্দেহ নেই। অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। উত্তরের জেলাগুলোতে খেটে খাওয়া ও শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। পরিবার-পরিজন ও জীবন-জীবিকার তাগিদে উত্তরাঞ্চলে পুরুষের পাশাপাশি স্বশিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত নারী দিণাঞ্চলের যেমন- নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, গাজীপুরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে পোষাকশিল্প ও বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বিপুলসংখ্যক নারীশ্রমিক কম খরচে ও স্বল্পসময়ে বাড়ি থেকে কর্মস্থল ও কর্মস্থল থেকে বাড়িতে যাতায়াত করতে পারবে। বছরের দুইটি ঈদ উৎসব ও পূজার ছুটিতে বাড়ি ফিরতে বাড়তি ভোগান্তি থেকে রেহাই পাবে। পরিবারকে সময় দিতে পারবে এবং এতে পরিবারের সাথে কর্মজীবী নারীদের দূরত্ব কমে আসবে। ফলে পারিবারিক মেলবন্ধন দৃঢ় হবে। এতে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে। দূরের কর্মক্ষেত্রের কাজের সুযোগ গ্রহণ করা সহজ হবে। 

নারীর উচ্চ শিক্ষার প্রসার ঘটবে

যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে নারীদের উচ্চ শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে। স্কুল কলেজে যাতায়াত সহজ হবে। ঝড়ে পড়ার হার কমে আসবে। উত্তরের জেলাগুলোর বাল্য বিয়ের হার কমে আসবে। দেশ শিক্ষিত একজন মা পেলে শিক্ষিত জাতি পাবে। উচ্চশিক্ষা নারী দেশের সম্পদ হয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে। 

সামাজিক ক্ষমতায়ন

নারী যখন সহজে নিজের কর্মক্ষেত্রে, শিা প্রতিষ্ঠান ও সেবাকেন্দ্রে যেতে পারেন, তখন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করে। 

নারী উদ্যোক্তাদের বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে

বিশ্বায়নের যুগে নারীরা আর বসে নেই। উত্তরের অনেক নারী হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প, বুটিক-বাটিক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন অনলাইন ব্যবসার সাথে যুক্ত রয়েছে। যোগাযোগ সহজ হলে এই সব উদ্যোক্তা নারী তাদের পণ্য বড় বাজারে সহজে পৌঁছাতে পারবে। অনলাইন ব্যবসার প্রসার ঘটবে। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে। নারীর আয় বৃদ্ধি পেলে পরিবারে তাদের সিদ্ধান্তগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের সুযোগ বাড়বে।

মায়েদের স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন ও সহজ হবে

গ্রামাঞ্চলের অনেক গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীরা সময়মতো উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হলে মাতৃ ঝুঁকি যেমন কমে আসবে, তেমনি নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা সহজ হবে। প্রসূতি মায়েদেরও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়া সহজ হবে। 

পরিশেষে

দ্বিতীয় যমুনা সেতু শুধুমাত্র একটি অবকাঠামো বললে ভুল হবে। এটি মানুষের দারিদ্র্যবিমোচন, উন্নয়ন, উত্তরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যবসার প্রসার, নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, যোগাযোগের সুবিধা, নারীর ক্ষমতায়নের একটি সম্ভাবনার মাধ্যম হতে পারে। যোগাযোগের নতুন এই দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়িত হলে উত্তরের অর্থনীতি যেমন গতিশীল হবে, তেমনি করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও নারীর উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

এক কথায় বলা যায়, দ্বিতীয় যমুনা সেতু শুধু নদীর দুই পাড়কে নয়, উন্নয়ন ও  সম্ভাবনার দুই তীরকেও একসূত্রে গেঁথে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা হতে পারে। 

*কবি-ছড়াকার ও সাংবাদিক