বাহাদুরাবাদ-বালাসী দ্বিতীয় যমুনা সেতু: উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন
প্রস্তাবিত এই সেতু বাস্তবায়িত হলে রংপুর বিভাগের আটটি জেলার প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। পাশাপাশি রাজশাহী বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষও এর সুফল ভোগ করবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১১ জেলার আড়াই কোটিরও বেশি মানুষের জন্য সৃষ্টি হবে একটি নতুন যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক করিডোর। এটি হবে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সেতুবন্ধন।
রিকতু প্রসাদ :
একসময় বাহাদুরাবাদঘাট ও বালাসীঘাট ছিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ। এই রুটে ট্রেন ও ফেরির মাধ্যমে মানুষ এবং পণ্য পরিবহন হতো। দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই নৌপথ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহাসিক রুট আজ অনেকটাই অবহেলিত। বর্তমানে নদী পারাপারের জন্য ছোট নৌকা, ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটের ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্ষাকালে প্রবল স্রোত, কুয়াশা কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এই যাতায়াত হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্ভোগের।
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বালাসীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন গাইবান্ধার মানুষ। স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও উন্নয়নকামী মানুষ বিশ্বাস করেন, এই সেতু নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে।
প্রস্তাবিত এই সেতু বাস্তবায়িত হলে রংপুর বিভাগের আটটি জেলার প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। পাশাপাশি রাজশাহী বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষও এর সুফল ভোগ করবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১১ জেলার আড়াই কোটিরও বেশি মানুষের জন্য সৃষ্টি হবে একটি নতুন যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক করিডোর। এটি হবে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সেতুবন্ধন।
বর্তমানে উত্তরাঞ্চল থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে যমুনা সেতু ব্যবহার করতে দীর্ঘপথ ঘুরতে হয়। দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে যাতায়াতের দূরত্ব অনেকটা কমে যাবে। সময় বাঁচবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহন হবে অনেক দ্রুত ও নিরাপদ। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন সহজ হবে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উত্তরাঞ্চল দেশের অন্যতম কৃষিভিত্তিক অঞ্চল। ধান, পাট, ভুট্টা, গম, আলু, পেঁয়াজ, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, দুধ ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে এই অঞ্চলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকরা অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমন কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে কৃষিপণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও হবে আরও কার্যকর ও আধুনিক।
শুধু কৃষিই নয়, শিল্প ও বাণিজ্য খাতেও এই সেতু নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দেবে। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উত্তরাঞ্চলে নতুন শিল্পকারখানা, হিমাগার, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, গুদাম ও লজিস্টিক কেন্দ্র গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। উত্তরাঞ্চলের মানুষ উন্নত চিকিৎসা কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সহজে যাতায়াত করতে পারবেন। জরুরি রোগী পরিবহন দ্রুত হবে, ফলে অনেক মূল্যবান প্রাণ রক্ষা সম্ভব হবে। শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ দুই-ই সাশ্রয় হবে।
পর্যটন শিল্পেও এ সেতু ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। উত্তরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীভিত্তিক পর্যটন, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলোতে পর্যটকদের আগমন বাড়বে। স্থানীয় অর্থনীতি আরও সচল হবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু জাতীয় নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বন্যা, নদীভাঙন কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।
বালাসীঘাট ও বাহাদুরাবাদ ঘাটের মধ্যকার এই সেতু শুধু দুটি নদীতীরকে সংযুক্ত করবে না, এটি হবে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক। বহু বছরের অবহেলা ও যোগাযোগ বৈষম্য দূর করে এই সেতু উত্তরবঙ্গকে জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করবে।
উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের এই স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়ন শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণ নয়, এটি হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই উন্নয়ন বিনিয়োগ। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের প্রসারে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তাই সরকারের কাছে উত্তরাঞ্চলের মানুষের একটাই প্রত্যাশা, বাহাদুরাবাদঘাট থেকে গাইবান্ধার বালাসীঘাট পর্যন্ত দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। এই সেতুই হতে পারে উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির নতুন মহাসড়ক, আড়াই কোটিরও বেশি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নপূরণের অন্যতম ভিত্তি।
* সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মী।