গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার: রসমঞ্জুরির স্বাদে বিশ্বজয়
প্রতিদিন আমাদের ঘরে সব মিলিয়ে রসমরি, মিষ্টি—সব মিলিয়ে প্রায় আট থেকে দশ মন বিক্রি হয়। গাইবান্ধা জেলার প্রায় প্রত্যেকটি উপজেলার মানুষ আমাদের এখানে আসে। সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, শাঘাটা, গোবিন্দগঞ্জ, সাদুল্লাপুর—সব জায়গার লোকজনই আছে।
আমাদের এখানে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ লিটার দুধ প্রসেসিং হয়। এই দুধগুলো আমরা আশেপাশের খামারগুলো থেকেই সংগ্রহ করে থাকি। শুরুতে যখন দোকান চালু করি, তখন আমাদের মিষ্টির আইটেম খুবই কম ছিল। রসমঞ্জুরি, রসগোল্লা, সাদা মিষ্টি, কালোজাম, চমচম—এই পাঁচ-ছয়টা আইটেম ছিল। কিন্তু এখন আল্লাহর রহমতে প্রায় ৫০–৫৫ রকমের মিষ্টি তৈরি করি। দোকান ও কারখানা মিলিয়ে আমাদের কর্মচারী সংখ্যা প্রায় ৩০–৩৫ জন।
রসমঞ্জুরি গাইবান্ধার একটি বিখ্যাত মিষ্টি, যেটা আমরা নিজেরাই তৈরি করি। প্রতিদিন প্রায় ২০০ কেজি রসমঞ্জুরি বানানো হয় এবং আমরা এটি ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। সাদা মিষ্টি, কালোজাম, চমচম—এগুলো ২৮০ টাকা কেজি। এছাড়া ডায়া সুইট আছে, যার দাম ৪৬০ টাকা কেজি। লাড্ডু রয়েছে ৪০০ টাকা কেজি। আরও দুই-এক রকমের সুস্বাদু মিষ্টি আছে।
আমাদের ছানা তৈরি করাটাই সবচেয়ে সেনসিটিভ কাজ। এক কেজি ছানা তৈরি করতে আমাদের সাত-আট কেজি দুধ লাগে। আর এক কেজি ছানা থেকে প্রায় চার থেকে সাড়ে চার কেজি মিষ্টি তৈরি হয়। ছানা তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুধের টাটকাতা। গরু থেকে দুধ দোহনের পর সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই দুধ প্রসেসিং করতে হয়। তা না হলে দুধ নষ্ট হয়ে যায় এবং ছানার মানও খারাপ হয়ে যায়।
আমাদের ডায়া সুইট তৈরি করতে সবচেয়ে বেশি সময় ও পরিশ্রম লাগে। গাইবান্ধা মিষ্টার ভান্ডারের নামডাক ছড়িয়েছে মূলত তখনই, যখন জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের কথা আসে এবং রসমঞ্জুরির নাম আলোচনায় আসে। তখন সবাই জানতে চেয়েছে—কোথায় ভালো রসমঞ্জুরি পাওয়া যায়। মানুষ আমাদের কাছে এসে রসমঞ্জুরি নিয়ে সন্তুষ্ট হয়েছে, আমরা তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি। সেখান থেকেই আমাদের নাম ছড়িয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত গরমে অনেক সময় দুধ নষ্ট হয়ে যায়, রসমঞ্জুরি নষ্ট হয়ে যায়, দই টক হয়ে যায়—এই সমস্যাগুলো মাঝে মাঝেই হয়। কিন্তু কাস্টমারের কথা চিন্তা করে এবং আমাদের সুনাম ধরে রাখার জন্য আমরা কখনোই খারাপ প্রোডাক্ট বিক্রি করি না।
আমাদের প্রতিষ্ঠাতার মূল উদ্দেশ্য ব্যবসা করা নয়, মানুষের সেবা করা। গাইবান্ধার মানুষকে ভালো মানের মিষ্টি খাওয়ানো—এইটাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। আল্লাহ তাঁর এই উদ্দেশ্য কবুল করেছেন, তিনি সফল হয়েছেন। মানুষ যখন আমাদের ভালো ফিডব্যাক দেয়, তখন আমাদের খুব ভালো লাগে।
আমাদেরও স্বপ্ন আছে। মিষ্টির পাশাপাশি আমরা বেকারি সংযোজন করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, সেখানেও আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি। ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু করার উদ্যোগ নেওয়ার আশা রাখি, ইনশাআল্লাহ।
গাইবান্ধা জেলাকে পরিচিত করার জন্য এবং জেলার সুনাম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই আমরা এই নামটি বেছে নিয়েছি—গাইবান্ধা মিষ্টার ভান্ডার। গাইবান্ধার বিখ্যাত রসমঞ্জুরি আমাদের মূল আকর্ষণ। এছাড়া ডায়া সুইট এবং হাড়িভাঙ্গাও ভালো চলে।
জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের আলোচনায় যখন এই বিষয়গুলো আসে, তখন আমরা ডিসি মহোদয়ের সাথে কথা বলেছিলাম। আমরা জানিয়েছিলাম—সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা রসমঞ্জুরির জন্য আইএসও সনদ নিতে চাই এবং ভবিষ্যতে যেন এটি বিদেশে রপ্তানি করা যায়। ডিসি মহোদয় আমাদের আশ্বস্ত করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
শুরুতে আমাদের ব্যবসা ছিল খুবই ছোট পরিসরে। তখন কর্মচারী ছিল পাঁচ-ছয় জন, দোকানও ছোট ছিল। এখন আলহামদুলিল্লাহ দোকান বড় হয়েছে, কর্মচারী সংখ্যা ৩০ জনের বেশি, উৎপাদন বেড়েছে, বিক্রি বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন আমাদের বিক্রি লক্ষ টাকার উপরে হয়। এটাকে আমরা অবশ্যই সাফল্য মনে করি।
শুধু রসমঞ্জুরির মাধ্যমেই আজ গাইবান্ধার নাম শুধু সারা দেশে নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের রসমঞ্জুরি এখন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে সরাসরি রপ্তানি না হলেও, প্রবাসী ভাইয়েরা বাংলাদেশে এলে আমাদের রসমঞ্জুরি বিদেশে নিয়ে যান।



