দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পর্যটন বিপ্লব
বালাসীঘাটের আশপাশের চরগুলোতে পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। চরের মেঠোপথ, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, কাশবন এবং শীতকালীন পাখির অভয়ারণ্যকে কেন্দ্র করে একটি সমৃদ্ধ ‘চর-ট্যুরিজম’ হাবও তৈরি করা সম্ভব হবে। উত্তাল যমুনায় ওয়াটার বাইক, স্পিডবোট ট্রিপ এবং রিভারক্রুজিংয়ের সুব্যবস্থা করে পর্যটকদের আকর্ষণ সৃষ্টি করা যাবে।
শাহ আলম যাদু :
যমুনা সেতু কিংবা পদ্মাসেতু কেবল দুটি পাড়কে সংযুক্ত করেনি, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ঠিক তেমনই একটি ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় যমুনা সেতু (গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্ট)। এই সেতু বাস্তবায়িত হলে কেবল পণ্য ও যাত্রী পরিবহণই সহজ হবে না, বরং গাইবান্ধাসহ পুরো উত্তরাঞ্চলের পর্যটন শিল্পে সূচনা হবে এক নতুন অধ্যায়ের।
নদী ও চর-কেন্দ্রিক পর্যটনের নতুন হাব
বালাসীঘাট এমনিতেই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে একটি প্রিয় নাম। বিস্তীর্ণ যমুনার বুক ঘেঁষে সূর্যাস্ত দেখা, ছোট-বড় অগণিত চরের রূপ উপভোগ করা কিংবা ঐতিহ্যবাহী নৌবিহার বা নৌকাবিলাস উপভোগের চমৎকার সুযোগ রয়েছে এখানে। তবে উপযুক্ত অবকাঠামো ও সহজ যোগাযোগের অভাবে এই সম্ভাবনা পূর্ণতা পাচ্ছে না।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে
বালাসীঘাটের আশপাশের চরগুলোতে পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। চরের মেঠোপথ, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, কাশবন এবং শীতকালীন পাখির অভয়ারণ্যকে কেন্দ্র করে একটি সমৃদ্ধ ‘চর-ট্যুরিজম’ হাবও তৈরি করা সম্ভব হবে। উত্তাল যমুনায় ওয়াটার বাইক, স্পিডবোট ট্রিপ এবং রিভারক্রুজিংয়ের সুব্যবস্থা করে পর্যটকদের আকর্ষণ সৃষ্টি করা যাবে।
উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন
বর্তমানে সিলেট কিংবা ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের রংপুর, দিনাজপুর বা বগুড়া অঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যেতে যমুনা সেতু হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ঠিক একইভাবে উত্তরাঞ্চলের পর্যটকদেরও সিলেট বা ময়মনসিংহে যেতে চরম ভোগান্তি ও অতিরিক্ত সময় গুনতে হয়।
প্রস্তাবিত এই সেতুটি নির্মাণ করলে যোগাযোগ ব্যবস্থা রূপ নেবে একটি সমন্বিত পর্যটন নেটওয়ার্কে:
সময় ও খরচের সাশ্রয়: উন্মোচিত হবে পর্যটন অর্থনীতি
পর্যটন শিল্পের অন্যতম বড় শর্ত হলো ‘সহজ ও স্বল্পব্যয়ী যাতায়াত’। বালাসী- বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে সেতু হলে পর্যটকদের যাতায়াত খরচ ও সময় অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে।
১. উভয়মুখী পর্যটক প্রবাহ: সিলেট বা শ্রীমঙ্গলের চা বাগান, জাফলং, টাঙ্গুয়ার হাওর এবং ময়মনসিংহের বিরিশিরির সৌন্দর্য উপভোগ করতে উত্তরাঞ্চল থেকে পর্যটকদের ঢল নামবে।
২. স্থানীয় কর্মসংস্থান: গাইবান্ধা ও জামালপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় হোটেল-রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্প ও পর্যটনভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ঘটবে, যা স্থানীয় তরুণদের বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করবে।
৩. ইকো-ট্যুরিজমের বিকাশ: নদীর দুই পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা পর্যবেক্ষণ এবং চরের দেশীয় সংস্কৃতি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
যমুনা নদীর বালাসী-বাহাদুরাবাদঘাট কেবল দুটি জেলার সীমান্ত নয়, এটি উত্তর ও পূর্ব বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও পর্যটনের এক অলিখিত সংযোগস্থল। এখানে সেতু নির্মাণ কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়- এটি গাইবান্ধাকে কেন্দ্র করে রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেটের মধ্যে এক নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বন্ধন তৈরি করবে। সরকারের সদিচ্ছা ও মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে এই দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়িত হলে, গাইবান্ধার নদী ও চর-ভিত্তিক পর্যটন রূপ নেবে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে।
* সাংবাদিক ও সংগঠক।