দ্বিতীয় যমুনা সেতু: দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার নতুন মাইলফলক
দেশের একটি বৃহৎ একটি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা যদি একটি মাত্র সেতুর ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। দ্বিতীয় যমুনা সেতু সেই ঝুঁকি হ্রাস করে জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও নিরাপদ করতে পারে।
হেদায়েতুল ইসলাম বাবু :
রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা- উত্তরের এ পাঁচ জেলা নিয়ে গঠিত রংপুর কৃষি অঞ্চল। দেশের আলু, ভুট্টা, গম, ধান, পাট এবং সবজি উৎপাদনের প্রধানতম অঞ্চল হিসেবে ধরা হয় উত্তরের জনপদকে। পরিসংখ্যান বলছে- শুধু রংপুর কৃষি অঞ্চলের এ পাঁচ জেলায় ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রায় ২৮ লাখ ৫৬ হাজার টনেরও বেশি আলু উৎপাদিত হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ শতাংশের বেশি। তার আগের মৌসুমেও এ অঞ্চলে ৩২ লাখ টনেরও বেশি আলু উৎপাদনের রেকর্ড গড়ে কৃষক।
কৃষি প্রধান এ অঞ্চল যে জাতীয় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি- পরিসংখ্যান থেকে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। কিন্তু এ অঞ্চলের উৎপাদিত কৃষিপণ্য দ্রুত রাজধানী, ময়মনসিংহ, জামালপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম বন্দর বা দেশের অন্য সব এলাকার ভোক্তাদের পাতে পৌঁছাতে গুনতে হয় অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যয়।
সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর বা রাজধানীর সাথে দ্রুততম সময়ে ও স্বল্প খরচে যোগাযোগে বড় বাধা যমুনা-ব্রহ্মপুত্র। ২০২১ সালের জুনে গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদঘাট রুটে নৌযান চলাচলের জন্য উভয় ঘাটে দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি ফেরিঘাট টার্মিনাল আশার আলো দেখায় ঠিকই। সেই আলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাস খানেকের মধ্যে যমুনা- ব্রহ্মপুত্রে নাব্য সংকটে বাতাসে মিলিয়ে যায় সেই স্বপ্ন।
দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত থাকার পর ঘাট দুটি ভিন্ন কাজে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয় বিআইডব্লিউটিএ। সেই ব্রিটিশ আমলে ১৯৩৮ সালে পিছিয়ে থাকা তথ্য প্রযুক্তির যুগে যাত্রী ও মালামাল পরিবহণে রেল ফেরি চলাচল করলেও আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে এসে আর কোনোভাবেই সচল হলো না গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় নৌরুটটি। যেহেতু নৌরুট সচল করা যাচ্ছে না, বিকল্প হিসেবে এ রুটে একটি সেতু এখন সময়ের দাবি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত যে সময়োপযোগী তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
বর্তমানে যমুনা সেতু হয়ে গাইবান্ধা থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ২৮০ কিলোমিটার, কুড়িগ্রাম থেকে প্রায় ৩৫০ এবং লালমনিরহাট থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার। বালাসীঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সেতু নির্মাণ করা হলে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার কমবে গাইবান্ধার সাথে ঢাকার দূরত্ব। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরের জেলাগুলোর ঢাকার সাথে দূরত্ব কমবে ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। অন্যদিকে গাইবান্ধা থেকে সিলেট সড়ক পথে ৪৭০ এবং গাইবান্ধা থেকে ময়মনসিংহ ২৬০ কিলোমিটার। আর সেতু নির্মাণ হলে এখান থেকে জামালপুর ৩০, ময়মনসিংহ ৮৫, টাঙ্গাইল ১০০, গাজীপুর ১২০ এবং সিলেটের পথ ২৬০ কিলোমিটারে নেমে আসবে। সর্বোপরি উত্তরের ৮ জেলার সাথে রাজধানী, সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চলের সাথে যোগাযোগে সময় ও দূরত্ব অনেক কমে যাবে। সহজ হবে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, সীমান্ত বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি- দেশের কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলা- রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিস্তীর্ণ জনপদ এখনো যমুনা নদী অতিক্রমের জন্য মূলত একটি করিডোরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে বাধা সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ঈদযাত্রায় ১০ দিনে ৩ লাখ ৬১ হাজারেরও বেশি যানবাহন যমুনা সেতু ব্যবহার করেছে এবং প্রায় ২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা টোল আদায় হয়েছে। আবার ২০২৬ সালের ঈদযাত্রায় একদিনে ৫১ হাজারের বেশি যানবাহন যমুনা সেতু অতিক্রম করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়- যমুনা সেতু তার ধারণক্ষমতার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ বহন করছে। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এই চাপ আরও বাড়বে।
যানবাহন, পণ্য পরিবহন এবং আন্তঃজেলা বাণিজ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও বিকল্প করিডোর গড়ে ওঠেনি। ফলে কোনো দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বা যানজটের কারণে এই করিডোরে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়ে সমগ্র উত্তরের অর্থনীতিতে।
দেশের একটি বৃহৎ একটি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা যদি একটি মাত্র সেতুর ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। দ্বিতীয় যমুনা সেতু সেই ঝুঁকি হ্রাস করে জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও নিরাপদ করতে পারে।
গাইবান্ধার বালাসী ও জামালপুরের বাহাদুরাবাদ একসময় পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রেল ও নৌ-যোগাযোগের কেন্দ্র ছিল। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার এই অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে উত্তরাঞ্চল ও রাজধানীর সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে উত্তর জনপদের সঙ্গে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগ আরও সহজ হবে। পাশাপাশি একটি বিকল্প সড়ক ও রেল করিডোর গড়ে উঠবে, যা জাতীয় পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ করবে।
অন্যদিকে পঞ্চগড়ে অবস্থিত বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরকে বলা হয় দেশের অন্যতম কৌশলগত বাণিজ্যকেন্দ্র। যে বন্দর ভারত, নেপাল ও ভুটানের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সরকারি বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বাংলাবান্ধাকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী ও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। এসব বন্দরের সঙ্গে রাজধানী, শিল্পাঞ্চল এবং সমুদ্রবন্দরের দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতেও প্রয়োজন দ্বিতীয় যমুনা সেতু।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়িত হলে গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, পরিবহন ব্যয় কমবে, শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ সহজ হবে এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে জাতীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে।
বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা দেখিয়েছে, বড় যোগাযোগ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে বহুগুণ প্রতিফলন (Multiplier Effect) সৃষ্টি করে। একটি নতুন সেতু মানে শুধু কংক্রিট ও ইস্পাত নয়, এটি নতুন শিল্প, নতুন শহর, নতুন কর্মসংস্থান, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিবিআইএন (BBIN) এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের লক্ষ্যে কাজ করছে। উত্তরাঞ্চলের স্থলবন্দরগুলো ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। একটি নতুন যমুনা করিডোর এসব বন্দরকে রাজধানী, সমুদ্রবন্দর এবং শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে সহায়ক হতে পারে।
দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্থান নির্ধারণ অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ কারিগরি, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক সমীক্ষার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তবে বালাসী-বাহাদুরাবাদ করিডোরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য যোগাযোগ সুবিধা বিবেচনায় এটিকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সমীক্ষার আওতায় আনা সময়ের দাবি। একটি সমীক্ষা শুধু একটি সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই করবে না; এটি উত্তরাঞ্চলের আগামী ৫০ বছরের যোগাযোগ, অর্থনীতি ও উন্নয়নের রূপরেখাও নির্ধারণ করবে। এখন প্রয়োজন কমপক্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা। আর যদি সেই সমীক্ষা ইতিবাচক হয়, তবে তা কেবল উত্তরাঞ্চল নয়- দ্বিতীয় যমুনা সেতু হবে সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার নতুন মাইলফলক।
* গণমাধ্যমকর্মী।