পরিকল্পনার ফাইলে বন্দী কোটি মানুষের স্বপ্ন: একটি সেতুর জন্য কত প্রজন্মের অপেক্ষা?
দশকের পর দশক ধরে রংপুর বিভাগের আটটি জেলার মানুষ এই সেতুর স্বপ্ন দেখে আসছেন। যে সেতু কেবল নদীর দুটি তীরকে নয়, দুটি অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যকে জুড়ে দেবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবের মাটিতে পা ফেলেনি। এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পনা, রাজনৈতিক অনীহা এবং কোটি টাকা অপচয়ের এক দীর্ঘ মর্মান্তিক ইতিহাস।
কায়সার রহমান রোমেল :
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে একটি অপূর্ণ স্বপ্ন। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদঘাট- এই দুটি প্রান্তের মধ্যে দূরত্ব যতটা ভৌগোলিক, তার চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়নের। ভৌগোলিক বিভাজন যখন কোনো অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তখন যোগাযোগ অবকাঠামো কেবল একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্প থাকে না- তা পরিণত হয় কোটি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। উত্তরবঙ্গের সেই লড়াইয়ের নাম আজ দ্বিতীয় যমুনা সেতু।
দশকের পর দশক ধরে রংপুর বিভাগের আটটি জেলার মানুষ এই সেতুর স্বপ্ন দেখে আসছেন। যে সেতু কেবল নদীর দুটি তীরকে নয়, দুটি অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যকে জুড়ে দেবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবের মাটিতে পা ফেলেনি। এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পনা, রাজনৈতিক অনীহা এবং কোটি টাকা অপচয়ের এক দীর্ঘ মর্মান্তিক ইতিহাস।
একটি ঘাটের ইতিহাস ও নীরব বেদনা
১৯৩৮ সাল। ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৎকালীন আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে গাইবান্ধার তিস্তামুখ ঘাট ও জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাটের মধ্যে চালু হয় ঐতিহাসিক রেলওয়ে ফেরি সার্ভিস। সমান্তরাল লাইনে চলা আস্ত রেলগাড়ির মালবাহী ওয়াগনগুলো খুলে আলাদা করে বিশেষ ১৩টি লাইনের ফেরিতে তুলে নদী পারাপার করার সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস আজও এ অঞ্চলের মানুষের স্মৃতিতে অম্লান। পণ্য পরিবহণের পাশাপাশি যাত্রী পারাপারও করা হতো ফেরিতে। রংপুর বিভাগের আটটি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের রেল যোগাযোগের এই লাইফলাইনটি ১৯৯০ সালে যমুনার নাব্য সংকটের কারণে তিস্তামুখ ঘাট থেকে ফুলছড়ির কঞ্চিপাড়ার বালাসীঘাটে স্থানান্তরিত হয়। আর তখন থেকেই ঘাটটি পরিচিতি পায় ‘বালাসীঘাট’ নামে।
কিন্তু ২০০৫ সালে যমুনা সেতুতে সরাসরি রেল সংযোগ চালুর পর এই ঐতিহ্যবাহী ফেরি রুটটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ দশকের পারাপারের পর সেই ঘাটে আজ ফেরি নেই, যাত্রী নেই। আছে কেবল ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি অত্যাধুনিক ফেরিঘাট টার্মিনাল- যার সমস্ত অবকাঠামো প্রস্তুত, অথচ কোনো নৌযান ভিড়ছে না সেই ঘাটে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই নির্মম অপচয় এবং জনদুর্ভোগের চিত্র দেখে মনে প্রশ্ন জাগে- উন্নয়নের এই অসঙ্গতি কি আমাদের পরিকল্পনাহীনতারই প্রতিফলন নয়?
১৪৫ কোটির ভুল পরিকল্পনা: নদী ও বিজ্ঞানের সংযোগহীনতা
যমুনা সেতুর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে এবং বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌরুটটি সচল করতে বিগত সরকারের আমলে প্রায় ১৩৬ থেকে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বালাসী ঘাটে একটি আধুনিক ফেরিঘাট টার্মিনাল, টোল প্লাজা, ব্যারাক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। একইভাবে অপরপ্রান্তে বাহাদুরাবাদ ঘাটেও আরেকটি টার্মিনাল নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বিশাল এই অবকাঠামো প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও সেখানে কোনো ফেরি চলাচল করতে পারেনি।
নদী ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যমুনা নদী অত্যন্ত পরিবর্তনশীল- এটি প্রতি বছর তার গতিপথ ও নাব্য পথ পরিবর্তন করে থাকে। প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নৌরুটটি সারা বছর ফেরি চলাচলের উপযোগী রাখতে হলে প্রতি বছর প্রায় ৩২ থেকে ৩৩ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করতে হবে, যার জন্য ৬ থেকে ৭টি ড্রেজারকে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত রাখা প্রয়োজন। এতে প্রতি বছর সরকারের অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। মূলত কোনো পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া তড়িঘড়ি করে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ার এই ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণেই শতকোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদের চূড়ান্ত অপচয় হয়েছে। এমতাবস্থায়, একটি স্থায়ী সেতু বা টানেল নির্মাণই এই অচলাবস্থার একমাত্র বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী সমাধান।
যাতায়াতের ক্ষত ও অর্থনৈতিক অবরুদ্ধতা
বর্তমানে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার সঙ্গে ঢাকার প্রধান সংযোগ সূত্র বর্তমান যমুনা সেতু, যা ১৯৯৮ সালে চালু হয়েছিল। কিন্তু সেতুটি নির্মাণের সময় যে পরিমাণ যানবাহনের চাপ প্রাক্কলন করা হয়েছিল, বাস্তবে তা বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩৮ হাজারেরও বেশি যানবাহন এই সেতু পারাপার হচ্ছে। ঈদের সময় বা ছুটির দিনে সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ১৩ থেকে ৪৫ কিলোমিটার যানজট তৈরি হচ্ছে। এটি কেবল যোগাযোগ সমস্যা নয়, এটি মানবিক সংকট।
অন্যদিকে, ঐতিহাসিক বালাসী-বাহাদুরাবাদ ফেরি রুটটি বন্ধ হওয়ার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা হলো ঝুঁকি নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যমুনা পার হওয়া। শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটের কারণে চরে আটকে থাকা নৌকা, মাইলের পর মাইল ঘোড়ার গাড়ি বা হেঁটে চলা ছাড়া বিকল্প নেই। নৌকার অপ্রতুলতার কারণে প্রতিদিন মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ জন যাত্রী পারাপার হতে পারেন, যা বর্ষা মৌসুমে কিছুটা বেড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ জনে দাঁড়ায়। এই ধারণক্ষমতা পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে চরম অনুপযোগী ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বিকল্প পথ হিসেবে সিরাজগঞ্জ হয়ে যে সড়কপথ ব্যবহার করা হয়, তাতে ময়মনসিংহ থেকে বগুড়া বা গাইবান্ধা যেতে প্রায় ১৮৩ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। এর ফলে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, দীর্ঘ যানজট এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই প্রতিকূলতার বিপরীতে প্রস্তাবিত বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতুটি নির্মিত হলে গাইবান্ধা থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার কমে আসবে এবং রংপুরের অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রে দূরত্ব কমবে প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার।
কেন বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটেই হওয়া উচিত নতুন সেতু
দ্বিতীয় যমুনা সেতুর জন্য বর্তমানে তিনটি রুটে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ করিডোর, গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ বা বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত রুট এবং নদী ও পরিবেশের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে অন্য কোনো উপযুক্ত করিডোর। কিন্তু বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটের পক্ষে যুক্তিগুলো একাধিক কারণে অত্যন্ত শক্তিশালী।
প্রথমত, ভৌগোলিক কৌশলগত সুবিধা: বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটটি বর্তমান যমুনা সেতু করিডোর থেকে উত্তরে অবস্থিত হওয়ায় এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন যোগাযোগ করিডোর তৈরি করবে। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান স্পষ্টভাবে বলেছেন, নতুন সেতুটি যমুনা সেতুর কাছাকাছি বা একই করিডোরে না করে ভিন্ন স্থানে নির্মাণ করাই যুক্তিসংগত। উত্তরবঙ্গের ‘গেটওয়ে’কে আরও বিস্তৃত করতে হলে ভিন্ন একটি প্রবেশপথ তৈরি করা জরুরি। বিশেষত, ফুলছড়ির বালাসী থেকে দেওয়ানগঞ্জের খোলাবাড়ি পর্যন্ত যমুনার প্রস্থ মাত্র ৪.৫০ কিলোমিটার হওয়ায় এখানে সেতু নির্মাণ করলে নির্মাণ ব্যয়ও অনেক হ্রাস পাবে।
দ্বিতীয়ত, বঞ্চিত জেলাগুলোর অবমুক্তি: এই সংযোগ সেতু নির্মিত হলে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর, শেরপুরসহ কমপক্ষে আটটি জেলার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ রুটে সেতু হলে কেবল বগুড়া থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে, অথচ বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে আটটি জেলার জন্য দূরত্ব হ্রাস পায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এই তুলনামূলক সুবিধাটি সুস্পষ্টভাবে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটের পক্ষে।
তৃতীয়ত, বিনিয়োগের ন্যায্যতা: ইতোমধ্যে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই রুটে ফেরিঘাট টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। এই অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে গেলে বিনিয়োগের মূল্য কিছুটা হলেও ফিরে আসবে। একটা টার্মিনাল বসে থেকে জং ধরলে জাতীয় সম্পদের অপচয় কেবল বাড়তেই থাকে।
চতুর্থত, কৃষি ও বাণিজ্যের সুবিধা: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য- ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, পাট- দ্রুত ঢাকা ও ময়মনসিংহের বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে। চরাঞ্চলের কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। পদ্মা সেতু যেভাবে দক্ষিণাঞ্চলে নতুন শিল্পাঞ্চল গড়েছে, এই সেতুও উত্তরাঞ্চলকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করবে।
সরকারি পরিকল্পনা: আশার আলো, তবে দেরি কাম্য নয়
২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, সেতু কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনায় ২০৩৩ সালের মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনটি সম্ভাব্য অ্যালাইনমেন্টে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলমান। রুট নির্ধারণের পর ব্যয় হিসাব করে সরকারি অর্থ, বিদেশি ঋণ বা পিপিপি মডেলে অর্থায়নের পথ বিবেচিত হবে বলেও মন্ত্রী জানিয়েছেন।
এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সংবাদ। কিন্তু বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পের ইতিহাস পড়লে শঙ্কা জাগে। পদ্মা সেতু যেভাবে দশকের পর দশক স্বপ্নেই থেকেছে, যমুনা সেতুও যেভাবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফল- সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে বলতে হয়, পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পথটি দীর্ঘ হলে জনদুর্ভোগ কেবল বাড়তেই থাকবে। ২০৩৩ সালের লক্ষ্যমাত্রা মানে আরও প্রায় সাত বছরের অপেক্ষা- এই বিলম্বের মূল্য দিতে হবে উত্তরবঙ্গের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
সাধারণ বাস্তবায়নের রূপরেখা বিবেচনায়, ২০২৬-২৭ সালে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করে ২০২৭-২৮ সালে ডিপিপি অনুমোদন, ২০২৯-৩০ সালে নির্মাণকাজ শুরু করলে সর্বনিম্ন চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। তার মানে, সেতু পেতে হয়তো ২০৩৩-৩৪ সালও পার হয়ে যাবে। প্রতিটি বিলম্বিত বছর মানে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি, লক্ষ লক্ষ মানুষের অকারণ দুর্ভোগ।
তৃণমূলের আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবিটি এখন এই অঞ্চলের প্রায় ২৬ লাখ এবং সামগ্রিকভাবে উত্তরবঙ্গের ২ কোটি মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দফায় দফায় স্মারকলিপি প্রদান, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন, মিছিল এবং সমাবেশের মাধ্যমে এই আন্দোলন ক্রমশ দানা বেঁধে উঠছে।
২০২৬ সালের মে মাসে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট এলাকায় আয়োজিত এক বিশাল মানববন্ধনে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-স্বেচ্ছাসেবী- পেশাজীবী সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ একযোগে অংশ নেন। ব্রহ্মপুত্র সড়ক ও রেলসেতু বাস্তবায়ন কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগেও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলেও এই দাবির পক্ষে জোরালো সমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত দেওয়ানগঞ্জে আয়োজিত এক সমাবেশে ঘোষণা করেছেন যে, দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্থান নির্ধারণে বাহাদুরাবাদ- বালাসী রুটটিকে এক নম্বর অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা হবে। একই সাথে দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ এলাকায় নদী ভাঙন রোধে ৫৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নদী শাসনের কাজও শুরু হয়েছে, যা সেতু নির্মাণের কারিগরি ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করবে।
বহুমুখী অর্থনৈতিক রূপান্তর ও সামাজিক সুবিধা
বালাসী-বাহাদুরাবাদ দ্বিতীয় যমুনা সেতু কেবল একটি সাধারণ কংক্রিটের অবকাঠামো নয়- এটি হবে উত্তরবঙ্গের আর্থ-সামাজিক বৈষম্য দূর করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। দেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সিংহভাগ ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট বেল্টে কেন্দ্রীভূত, যার ফলে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
এই সেতু নির্মিত হলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যাতায়াতের সময় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা থেকে কমে মাত্র ৩ থেকে ৫ ঘণ্টায় নেমে আসবে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। ব্রহ্মপুত্র নদের উভয় পাশে নদী শাসনের ফলে হাজার হাজার একর চর এলাকা আবাদযোগ্য জমিতে পরিণত হবে।
সামাজিক ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন হবে আরও গভীর। বন্যা বা খারাপ আবহাওয়ায় নৌযোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে রোগীর অ্যাম্বুলেন্স ও শিক্ষার্থীরা যে বিপদে পড়েন, স্থায়ী সেতু সেই ভোগান্তি চিরতরে দূর করবে। শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই সেতু যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে- বিশেষত ময়মনসিংহের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত অত্যন্ত সহজ হবে। স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গাইবান্ধায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পথও সুগম করবে এই সংযোগ।
যমুনার বুকে জেগে ওঠা অসংখ্য চরে বাস করেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। বন্যায় তারা বারবার সর্বস্ব হারান। চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান- সবকিছুতেই তারা পিছিয়ে। একটি সেতু এই চরবাসীদের মূল জীবনধারার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ দেবে। এটি তাদের সন্তানের স্কুলে যাওয়ার পথ, অসুস্থ মায়ের হাসপাতালে পৌঁছানোর পথ, কৃষকের ফসল বিক্রির পথ সৃষ্টি করবে।
প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ ও টেকসই সমাধানের পথ
যমুনা নদীর প্রবল স্রোত, বিস্তীর্ণ প্রবাহ এবং বেলে চরের উপস্থিতি যে-কোনো সেতুর স্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা অসম্ভব নয়- পদ্মা সেতুই তার প্রমাণ। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি ও পরিবেশগত সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করতে হবে। বিগত সরকারের সময়ে কোনো সমীক্ষা ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে টাকা গচ্চা দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের গতিশীল আচরণকে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নদী শাসনের পাশাপাশি প্রয়োজনে আধুনিক সাসপেনশন ব্রিজ বা আন্ডার-রিভার টানেল নির্মাণের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি কেবল বর্তমান ট্রাফিক চাহিদাই মেটাবে না বরং আগামী একশো বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধারণ করতে সক্ষম হবে।
অর্থায়নের বিষয়ে, পদ্মা সেতুর মতোই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা বা পিপিপি মডেলে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। উল্লেখযোগ্য যে, সরকার ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য ফ্রান্স-কোরিয়ান দলের নেতৃত্বে পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে- যা প্রকল্পের প্রতি সরকারের সদিচ্ছার একটি ইতিবাচক সংকেত।
বিলম্বের বিলাসিতা আর নয় এই প্রকল্পকে সফল করতে হলে সরকারকে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে:
সড়ক, রেল ও নদী পরিবহন বিভাগকে একটি সমন্বিত কমিটির মাধ্যমে কাজ করতে হবে, যাতে সেতুর সঠিক অবস্থান নিরূপণ ও ভৌগোলিক তথ্যভাণ্ডার আপডেট হয়। পরিবেশ ও সামাজিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের উদ্বেগ অনুযায়ী নদী শাসন ও সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভব হলে নদীজল-প্রবাহ এবং চরের দখলসংক্রান্ত বিষয়গুলো অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। জমি অধিগ্রহণ ও পরিবেশ ছাড়পত্র দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যেন ফাইলের স্তূপে হারিয়ে না যায় এবং পরিকল্পনা যেন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ না থাকে। আগামী নির্ধারিত বাজেটে সেতুটির অর্থ বরাদ্দ অন্তর্ভুক্ত করা এবং কাজ ত্বরান্বিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।
নদীর দুটি তীর নয়, দুটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ
বর্তমান যমুনা সেতু ১৯৯৮ সালে চালু হওয়ার পর উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে যে বিপ্লব এসেছে, তা আমরা দেখেছি। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের জন্য যা করেছে, দ্বিতীয় যমুনা সেতু উত্তরাঞ্চলের জন্য তার চেয়ে কম কিছু করবে না। একটি সেতু কীভাবে একটি অঞ্চলের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে- সেটি বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে।
ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশরা এই ঘাটের গুরুত্ব বুঝেছিল। আশা করি, স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার আর কাল বিলম্ব না করে উত্তরবঙ্গের মানুষের এই ন্যায্য দাবিকে বাস্তবে রূপ দেবে।
দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা অপরিহার্য। গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদঘাট পর্যন্ত একটি সেতু নির্মাণ এখন আর কেবল স্থানীয় দাবি নয়- এটি জাতীয় প্রয়োজনীয়তা, লক্ষ লক্ষ মানুষের অধিকার, বাংলাদেশের সুষম উন্নয়নের অনিবার্য শর্ত।
সরকারের মহাপরিকল্পনায় এই রুটটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু করাই হবে বর্তমান নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে দূরদর্শী পদক্ষেপ। বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ- এই পথের সেতু কেবল নদীর দুটি তীর নয়, দুটি অঞ্চলের ভবিষ্যতকে জুড়ে দেবে।
*লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী