দ্বিতীয় যমুনা সেতু কেন প্রয়োজন?
দ্বিতীয় যমুনা সেতু আজ কোনো স্বপ্ন নয়- এটি সময়ের দাবি, উন্নয়নের দাবি এবং একটি সমন্বিত বাংলাদেশের দাবি।
আবু সায়েম শান্ত :
উত্তরাঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৃষি উৎপাদন এলাকা। ধান, আলু, মরিচ, ভুট্টা, গম, শাকসবজি, দুধ ও মৎস্য উৎপাদনে এই অঞ্চলের অবদান জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে এই অঞ্চলে সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পেরও বিস্তার ঘটছে। কিন্তু উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে উৎপাদনের পূর্ণ সুফল অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, সময় নষ্ট হয় এবং পণ্য বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটে। তাই এই অঞ্চলের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার একটি হলো যমুনা নদী অতিক্রমের সীমিত সুযোগ।
বর্তমানে যমুনা বহুমুখী সেতু উত্তরাঞ্চল ও রাজধানীর মধ্যে প্রধান সংযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যা, যানবাহনের সংখ্যা এবং পণ্য পরিবহন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই একক সংযোগের ওপর চাপও বহুগুণ বেড়েছে।
একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা যত শক্তিশালী হয়, তার অর্থনীতিও তত গতিশীল হয়। উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলার কোটি মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিল্পের কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিতে দ্রুত, নিরাপদ ও বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। একটিমাত্র সেতুর ওপর এত বড় অঞ্চলের নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সেতুতে চলাচল ব্যাহত হলে দেশের একটি বড় অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আধুনিক যোগাযোগ পরিকল্পনায় তাই গুরুত্বপূর্ণ নদীর ওপর বিকল্প সংযোগ তৈরি করাকে অপরিহার্য ধরা হয়।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চল, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং রাজধানীর মধ্যে নতুন যোগাযোগ করিডোর সৃষ্টি হবে। যাত্রা সময় কমবে, পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে, পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা সরাসরি লাভবান হবেন। একইসঙ্গে নতুন শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক হাব, গুদাম, পর্যটন ও সেবাখাতের বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে গাইবান্ধার বালাসী থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ রুটে সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। এই রুট বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। পাশাপাশি দেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে একটি বিকল্প জাতীয় করিডোর গড়ে উঠবে, যা বিদ্যমান সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, বড় অবকাঠামো কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করেনা- এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রও তৈরি করে। একটি সেতুর দুই প্রান্তে গড়ে ওঠে নতুন শহর, শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। দ্বিতীয় যমুনা সেতুও উত্তরাঞ্চলের জন্য তেমনই মানুষের জীবনমান বদলে দেওয়ার প্রকল্প হতে পারে।
কেবল একটি সেতু নির্মাণের প্রশ্ন নয়, এটি আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং জাতীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার একটি কৌশলগত উদ্যোগ। উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়নের এখনই উপযুক্ত সময়।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু আজ কোনো স্বপ্ন নয়- এটি সময়ের দাবি, উন্নয়নের দাবি এবং একটি সমন্বিত বাংলাদেশের দাবি।
বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটের কৌশলগত গুরুত্ব
গাইবান্ধার বালাসী ও জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঐতিহাসিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট। এই রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে-
· উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের দূরত্ব কমবে;
· কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে;
· শিল্পপণ্যের পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে;
· নতুন শিল্পাঞ্চল, গুদাম ও লজিস্টিক হাব গড়ে উঠবে;
· দেশের জন্য একটি বিকল্প জাতীয় সড়ক ও রেল করিডোর তৈরি হবে;
· আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত বিনিয়োগ
বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা বলছে, বড় সেতু শুধু যোগাযোগের অবকাঠামো নয়, এটি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও নগরায়ণের নতুন কেন্দ্র তৈরি করে। দ্বিতীয় যমুনা সেতুও উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নকে জাতীয় প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আরও শক্তিশালীভাবে যুক্ত করতে পারে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, পুরো বাংলাদেশ লাভবান হবে। কারণ এটি দেশের যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে আরও নিরাপদ এবং ভবিষ্যতমুখী করে তুলবে।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি হলেও এর প্রয়োজনীয়তা কোনো একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য একটি কৌশলগত জাতীয় বিনিয়োগ। সেই কারণেই বিষয়টি আঞ্চলিক আবেগের সীমা পেরিয়ে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
* গণমাধ্যমকর্মী।