ফেরির স্মৃতি পেরিয়ে বালাসী-বাহাদুরাবাদে সেতুর স্বপ্ন
বালাসী সেতু অথবা এপার-ওপার সংযোগের জন্য একটি সেতু কিংবা টানেল নির্মাণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের দু’পাড়ের মানুষ। ১৯৯০-এর পর থেকেই এই সেতু অথবা টানেলের জন্য মানুষ বুক বেঁধে আন্দোলন সংগ্রামকে বেগবান করে তুলছে। তাদের দাবি, বালাসী হতে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত আর একটি সেতু বা টানেল নির্মাণ করে সরকার তাদের দুঃখ মোচন করবে।
সৈয়দ নুরুল আলম জাহাঙ্গীর :
আমার জন্মের ১৩ বছর আগে তিস্তামুখঘাট হতে দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ অবধি ফেরি পারাপার চালু করেছিল তৎকালীন ইষ্ট-বেঙ্গল রেলওয়ে বিভাগ। ঐতিহাসিক সূত্রে ফেরি পারাপার শুরু হয় ১৯৩৮ সালে। পরবর্তীতে এই ফেরিঘাট তার ভৌগোলিক সীমারেখায় ২টি স্বাধীনতা দেখেছে। একটি ১৯৪৭ সালে, অন্যটি ১৯৭১ সালে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরেও ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ফেরি পারাপার অব্যাহত ছিল, বন্ধ হয়ে যায়নি।
প্রথমে ফুলছড়ির তিস্তামুখঘাট, তারপরে বালাসীঘাট থেকে এই ফেরিঘাটের কার্যক্রম শুরু হয়। ফুলছড়ি ও বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাটের দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে ব্যাবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সম্প্রীতি, মেলবন্ধন ছাড়াও শিক্ষা-সংস্কৃতির বিনিময় আজও অটুট রয়েছে। যমুনা-ব্রহ্মপুত্রে নাব্য সংকটের আগ পর্যন্ত দুই তীরের বিশাল ভূখণ্ডের মানুষের যোগাযোগ বজায় রেখেছিল এই দুটি ফেরিঘাট। ফুলছড়ির তিস্তামুখঘাট হতে ওপারের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদঘাট দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষ বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লায় অবাধে যাতায়াত করতো।
এই পথে সারাদেশের সাথে গড়ে উঠেছিল উত্তরের ব্যাবসা-বাণিজ্যের এক বিশাল সংযোগ ও সমন্বয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েও কিন্তু উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের রেলযোগাযোগের একমাত্র রুট ছিল এই তিস্তামুখঘাট ও বাহাদুরাবাদঘাট। উত্তরাঞ্চলের ৮ জেলার মানুষ ট্রেনে তিস্তাামুখঘাট হয়ে ফেরিতে যমুনা পাড়ি দিয়ে বাহাদুরাবাদ হয়ে ট্রেনে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছাতো।
উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে এই যাত্রা ছিল চমকপ্রদ। চলন্ত স্টিমারে বসে দূরের ছুটতে থাকা নদীতীর দেখা, কখনো সূর্য উঠা, কখনো সূর্য ডোবা দেখা- এমন রোমাঞ্চকর দৃশ্যপট মুগ্ধ করতো মানুষকে। পণ্য পরিবহন ছিল উত্তরাঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। হাজারো শিক্ষার্থী এই পথেই উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত করেছে। দেশের বৃহত্তম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ থেকে পড়াশোনা শেষে উচ্চ পদে নিয়োজিত হয়েছেন অনেকেই। রাজধানী ঢাকার সাথে যোগাযোগের একমাত্র এই ট্রেন পথটিই ছিল উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার; ঢাকা থেকে সুদূর দিনাজপুর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি মেইল ট্রেন চলাচল করতো, যার একটির নাম ছিল উত্তরবঙ্গ মেইল বা ঢাকা মেইল। দক্ষিণ ও পশ্চিমবঙ্গের সাথে এই ট্রেনটি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছে।
১৯৯০ সালে প্রমত্ত যমুনা-ব্রহ্মপুত্র এ দুটি নদী নাব্য এতটা হারিয়ে ফেলে যে, ঐ নৌপথে ফেরি চলাচল একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। সীমাহীন নাব্য সংকটের কারণে তিস্তামুখঘাট বালাসীতে নিয়ে আসা হয়। বালাসীঘাটে শুরু হয় রেলওয়ের ফেরিঘাটের মহাযজ্ঞ। বিপুলসংখ্যক নৌযান, নৌকার ভিড়ে বালাসী ফেরিঘাট একটি অস্থায়ী নৌবন্দর নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৯০ সালে বালাসী-বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাটটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উত্তরাঞ্চলের ৮ জেলা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারায়। এই ফেরিঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এক অশনি-সংকেতের মুখে পড়ে। কিন্তু স্থবির হয়ে পড়া এই জনজীবনে কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। এই এলাকার মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল আবার তারা কর্মসংস্থান ফিরে পাবে।
দুই পাড়ের জেলাগুলির মানুষের আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনধারা আগের চেয়েও বর্ণাঢ্য হয়ে উঠবে। তাদের মনে অনেক আশা। বালাসী সেতু অথবা এপার-ওপার সংযোগের জন্য একটি সেতু কিংবা টানেল নির্মাণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের দু’পাড়ের মানুষ। ১৯৯০-এর পর থেকেই এই সেতু অথবা টানেলের জন্য মানুষ বুক বেঁধে আন্দোলন সংগ্রামকে বেগবান করে তুলছে। তাদের দাবি, বালাসী হতে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত আর একটি সেতু বা টানেল নির্মাণ করে সরকার তাদের দুঃখ মোচন করবে। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরবঙ্গের কয়েক কোটি অধিবাসী ভাবছে, দেশের সর্ববৃহৎ যমুনা সেতুতে এখন সারা দেশের যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। মাঝেমাঝেই এই চাপের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে যানজট, দুর্ঘটনা- যানবাহনে যাতায়াতকারী মানুষের নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেশের ট্রেনপথে মালামাল পরিবহন এখন শূন্যের কোঠায় বলা যায়। দেশী-বিদেশী মালামালের ট্রাক-ট্যাংকলরিগুলি যমুনা সেতুর উপর দিয়ে যাতায়াত করছে। ফলে যমুনা সেতুর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ।
বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি চালুর সব সম্ভাব্যতা সরকারিভাবেই স্থগিত হয়েছে। ফেরি সার্ভিসের বদলে বিকল্প লঞ্চ চালুর পরিকল্পনাও পরীক্ষামূলকভাবে যুক্তিযুক্ত না হওয়ায় স্থগিত হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে উন্নয়নের বিকাশ ঘটাতে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এখন বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌ-পথে সেতু অথবা টানেল নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। এই পথে টানেল অথবা সেতু নির্মাণ করা হলে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সাথে ঢাকা, সিলেট, চিটাগাং বিভাগের যোগাযোগে ও পণ্য পরিবহনে বিশাল দূরত্ব কমে যাবে, সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। উত্তরাঞ্চলের বিশাল এলাকাজুড়ে মানুষের জীবনধারার উন্নয়ন ঘটবে।
* লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।