আমাদের নদীপথ এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতু
তিনটি স্থানকে বিবেচনায় নিলে সবকিছু বিবেচনায় বালাসীঘাটই হবে সবচেয়ে উত্তম স্থান। তাই বালাসীঘাটেই হোক ২য় যমুনা সেতু। বালাসীঘাটে যমুনা সেতু হলে উত্তরের জেলাগুলোর সাথে রাজধানীসহ ময়মনসিংহ বিভাগ এবং সিলেট বিভাগের সব জেলাগুলোর সাথে যোগাযোগের অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
উত্তম কুমার দেবগুপ্ত :
নদ-নদীর দেশ বাংলাদেশ। উজান থেকে আসা নদীর জলের সঙ্গে বয়ে নিয়ে আসা পলিমাটি এই দেশের ভূমি গঠনে ভূমিকা রেখেছে। জলের প্রাপ্যতা সহজলভ্য হওয়ায় নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে জনপদ। উজান থেকে বয়ে আসা ৫৪টি আন্তঃদেশীয় নদী, দেশের ভিতরে সৃষ্টি হওয়া নানান নদ-নদী তাদের শাখা-প্রশাখা বটবৃক্ষের ডালপালার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরে। বয়ে যাওয়া নদীগুলো দুইপাড়ের মানুষের মাঝে তৈরি করছে বিচ্ছিন্নতা। বড়ো নদীগুলোর তীরবর্তী এক পাড়ের মানুষের সাথে অন্য পাড়ের মানুষের মাঝে তৈরি হওয়া এই বিচ্ছিন্নতা তাদের মাঝে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির মধ্যেও বেশ পার্থক্য গড়ে দেয়। বিচ্ছিন্নতার মেলবন্ধন হিসেবে মানুষ ব্যবহার করতো ভেলা, নৌকা এবং পরবর্তীতে ছোট বড়ো যান্ত্রিক যান।
একসময়, বলতে গেলে ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই নৌ- পথগুলো। তখন সড়কপথগুলো বেশিরভাগই ছিলো কাঁচা, দূরের পথগুলোর মাঝে পড়তো ছোট-বড় নদী। যার কারণে মানুষের যোগাযোগ এবং পণ্য আদান প্রদানের জন্য নির্ভর করতে হতো নদীপথগুলোর ওপর। তবে, কালের বিবর্তনে নৌপথগুলোর ওপর সেই নির্ভরতা এখন অনেকাংশেই কমে গেছে। এর পেছনে নানাবিধ কারণ। যার মধ্যে অন্যতম-
১) সড়কপথের অভূতপূর্ব উন্নতি। নদীগুলোর ওপর তৈরি হয়েছে ছোট বড়ো সড়ক সেতু;
২) শুষ্ক মৌসুমে নদীপথগুলো প্রায় শুকিয়ে যায়। বড়ো নদীগুলোতে চর পড়ার কারণে নৌ চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। সর্বোপরি নাব্যতার অভাবে নৌ চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে;
৩) পণ্য পরিবহনে সড়কপথের চেয়ে সময় বেশি লাগে। এছাড়াও নৌকাডুবি এবং নৌ-ডাকাতির ঝুঁকি থাকায় এই পথটিকে অজনপ্রিয় করেছে;
৪) ইজারাদারি প্রথা এবং দৌরাত্ম্যের কারণে কম খরচে মানুষের যোগাযোগ এবং পণ্য আদান প্রদানের এই পথটিকে বেশ ব্যয়বহুল করেছে। ফলে এই পথটির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সড়কপথের উপর ঝুঁকেছে।
এছাড়াও সরকারের উপেক্ষা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে যোগাযোগের এই মাধ্যমটি দিনকে দিন অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছে। যদিও যোগাযোগের এই মাধ্যমটি সচল রাখতে পারলে সড়ক পথের ওপর এই অসহনীয় চাপ অনেকখানি কমে যেতো।
নৌ-পথের উপর মানুষের নির্ভরতা কমে যাবার ফলে যোগাযোগের সম্পূর্ণ চাপটি সড়কপথের ওপর পড়েছে। ইতোমধ্যেই সড়কপথের অভূতপূর্ব উন্নতি, যোগাযোগের ক্রমবর্ধমান এই চাপ কিছুটা সহনীয় হলেও দিনকে দিন এই চাপ বাড়ার ফলে এবং নতুন নতুন পথ তৈরি না করলে একসময় অসহনীয় হয়ে পড়বে। এখানে উল্লেখ্য যে, এখনো অনেকসময় লেগে থাকা যানজট মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলছে।
বাংলাদেশের উত্তরের জেলাগুলো দেশের অন্য জনপদের উন্নতির সাথে তুলনা করলে এখনো অনেকখানি পিছিয়ে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ উত্তরাঞ্চলের এই জেলাগুলোতে শিল্প কলকারখানা অপ্রতুল। কৃষিতে এই জেলাগুলো অভাবনীয় উন্নতি করলেও কলকারখানা না থাকায় যথেষ্ট কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে দেশের দরিদ্রতম জেলাগুলোর অবস্থান এই উত্তরাঞ্চলে। যথেষ্ট কর্মসংস্থান না থাকায় কর্মহীন এই বিশাল জনগোষ্ঠী রাজধানীমুখী। বিভিন্ন প্রয়োজনে উত্তরাঞ্চলের এই মানুষদের ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এবং দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যেতে হয়। এর বড়ো অংশই যায় রিকশা চালাতে, কেউবা যায় ইটভাটায় কাজ করতে আবার কেউবা গার্মেন্টেসে যায় শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে। রাজধানীমুখী এই জনচাপ যাবার একমাত্র পথ ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক। এছাড়াও উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য রাজধানীসহ দক্ষিণবঙ্গে যাবার একমাত্র পথও এই রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক।
আবার রাজধানী থেকে বিভিন্ন কমডিটি পণ্য, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, সার, লোহালক্কড়, সিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের জন্য নির্ভরশীল এই মহাসড়ক। একটিমাত্র সড়কের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা এই যোগাযোগ ব্যবস্থা যে-কোনো কারণে সাময়িক বন্ধ হলে যে বিপর্যয় তৈরি হবে, তা অকল্পনীয়। ছয়লেনের এই মহাসড়ক আপাতত স্বস্তি দিলেও, জনসংখ্যার চাপ এবং ক্রমবর্ধমান হারে যানবাহন বাড়ার ফলে খুব দ্রুতই এই স্বস্তি অসহনীয় যানজটে অমানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলবে।
সরকার ভবিষ্যতে মহাসড়কে ক্রমবর্ধমান এই চাপ মোকাবেলার জন্য দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ। সেতুটি নির্মাণের লক্ষ্যে যমুনার পশ্চিমপাড়ে তিনটি সম্ভাব্য স্থান বিবেচনা করেছে।
১) সারিয়াকান্দি, ২) ফুলছড়ি, ৩) বালাসীঘাট; নিচে তিনটি স্থানের সুবিধা-অসুবিধা নীচে আলোচনা করা হলো।
১) সারিয়াকান্দি :
বগুড়া জেলার যমুনা তীরবর্তী একটি উপজেলা সারিয়াকান্দি। বগুড়া থেকে উপজেলাটির দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। সারিয়াকান্দির কালিতলা যমুনা নদীর ঘাট। স্থানীয় মানুষজন যমুনার চরগুলো ছাড়াও বিশেষ করে জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ যাবার জন্য মূলত এই ঘাটটি ব্যবহার করে থাকে। পাশাপাশি জেলার অন্যান্য অঞ্চলের মানুষজন অল্প-বিস্তর ব্যবহার করে থাকে। এখানে ২য় যমুনা সেতু তৈরি হলে বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট জেলার মানুষজন জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ জেলার সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতুটির ওপর নির্ভরশীল হবে।
তবে এই অঞ্চলের মানুষজন রাজধানীর সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দূরত্বের কারণে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ব্যবহার করবে। একইভাবে উত্তরের জেলাগুলো রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়ের মানুষজন রাজধানীর সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যেহেতু সারিয়াকান্দির উপর দিয়ে গেলে দূরত্ব বাড়বে, যার কারণে উত্তরাঞ্চলের মানুষজন রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের উপরই নির্ভরশীল থাকবে। যদিও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলোর সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে উত্তরের এই জেলাগুলো কিছুটা এই সেতু ব্যবহার করবে বলে আমার ধারণা। তবে সেতুটি এই স্থানে হলে প্রত্যাশিত ব্যবহার হবে বলে মনে হয়না। এখানে সেতু নির্মাণের প্রস্তাবটি অনেকটা আঞ্চলিকতার কারণে নেওয়া হতে পারে বলেই প্রতীয়মান হয়।
২) ফুলছড়ি :
ফুলছড়িঘাট গাইবান্ধা জেলার একটি ঐতিহ্যেবাহী একটি স্থান। ১৯৩৮ সাল থেকে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য রেল ফেরি সার্ভিস চালু হয়। নাব্য সংকটের কারণে ১৯৯০ সালে ঘাটটি স্থানান্তরিত হয়ে বালাসীঘাটে চালু হয়। এখানে ২য় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবিটি হঠাৎ করেই সামনে এসেছে। একসময় যেহেতু এখানে স্টিমারঘাট ছিলো, হয়ত সে কারণে এ অঞ্চলের মানুষ ফুলছড়িতে ২য় যমুনা সেতুর দাবিটি তুলেছে। সেতুটি এখানে নির্মাণ হলে উত্তরের জেলাগুলোর সাথে রাজধানীসহ ময়মনসিংহ বিভাগের যোগাযোগের দিগন্ত উন্মোচিত হবে বটে, তবে এক্ষেত্রে ২০ কিলোমিটার রাস্তা অতিরিক্ত যোগ হবার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে কিনা সে সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। এছাড়াও এই অঞ্চলে যমুনা নদীতে পলি জমার প্রবণতা বেশি। তাই এখানে সেতু নির্মাণ টেকনিক্যাল কারণে বিপদ ডেকে আনতে পারে।
৩) বালাসীঘাট :
১৯৯০ সালে নাব্য সংকটে ফুলছড়ি রেল ফেরিঘাট বন্ধ হলে বালাসীঘাটে রেল ফেরিঘাট স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীতে নাব্য সংকটের কারণে এই ফেরিঘাটটিও বন্ধ হয়ে যায়। ফেরি চলাচল বন্ধ হলেও এই ঘাটটি কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার সাথে যোগাযোগ থেকে শুরু করে ময়মনসিংহ বিভাগের সব জেলার সাথে যোগাযোগের অন্যতম নৌঘাট হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এমনকি রাজধানীর সাথে যোগাযোগের জন্য উত্তরবঙ্গের অনেক মানুষ এখনো ঘাটটিকে ব্যবহার করে থাকে। এখানে সড়ক সেতু কিংবা টানেল নির্মাণের দাবিটি বেশ পুরোনো।
জেলা শহর থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বালাসীঘাটে ২য় যমুনা সেতু নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর সাথে রাজধানীর যোগাযোগের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। উত্তরের জেলাগুলোর সাথে রাজধানীর দূরত্ব যেমন কমবে তেমনি উত্তরের জেলাগুলোর সাথে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের জেলাগুলোর যোগাযোগের দূরত্ব অনেকখানি ঘুচবে। সেইসাথে বগুড়া, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার মানুষজন ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলোর সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতুটির পরিপূর্ণ সুবিধা পাবে।
তিনটি স্থানকে বিবেচনায় নিলে সবকিছু বিবেচনায় বালাসীঘাটই হবে সবচেয়ে উত্তম স্থান। তাই বালাসীঘাটেই হোক ২য় যমুনা সেতু। বালাসীঘাটে যমুনা সেতু হলে উত্তরের জেলাগুলোর সাথে রাজধানীসহ ময়মনসিংহ বিভাগ এবং সিলেট বিভাগের সব জেলাগুলোর সাথে যোগাযোগের অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
* লেখক ও স্বাস্থ্যকর্মী।